এক ভূমিপুত্র বীরের শপথ
একজন ভূমিপুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধাকে, তাঁর নাম ফজলুর রহমান।যে সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধকে তুচ্ছ করছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান–অপদস্ত করছিল, জাতীয় সংগীত ও স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে চাইছিল; যে সময়ে বাংলার সহজিয়া মানুষের আশ্রয়স্থল মাজারগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, কবরের শান্তি ভাঙা হচ্ছিল, আর ক্ষমতায় যাওয়ার অশুভ নকশা আঁকা হচ্ছিল—ঠিক সেই সময়ে ফজলুর রহমান বলেছিলেন এক কঠিন, অটল কথা:
“বাংলাদেশ যদি বাংলাদেশই থাকে, তবে এই দেশে জামায়াত ক্ষমতায় যেতে পারবে না।”
এ ছিল নিছক বাক্য নয়—এ ছিল ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উচ্চারিত এক নৈতিক শপথ।
এবার একটি প্রাচীন গল্পের দিকে তাকাই—মহাভারতের কুরুক্ষেত্র। ত্রয়োদশ দিনের যুদ্ধে, অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু চক্রব্যূহে আটকা পড়ে নির্মমভাবে নিহত হন। চিতায় মুখাগ্নির মুহূর্তে অর্জুন ভাইদের প্রশ্ন করেছিলেন—কে তাঁদের বাধা দিয়েছিল? উত্তর এসেছিল—জয়দ্রথ।
শোকে ও ক্রোধে অর্জুন তখন ঘোষণা করেছিলেন—সূর্যাস্তের আগেই তিনি জয়দ্রথকে পরাজিত করবেন; নচেৎ নিজের জীবনকেও সেই শোকের আগুনে সঁপে দেবেন। এই শপথ ছিল ব্যক্তিগত, কিন্তু তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল পাণ্ডববাহিনীতে—ব্যক্তিগত শোক রূপ নিয়েছিল সামষ্টিক সংকল্পে।
ইতিহাসবিদরা একে বলেন, “প্রাইভেট গ্রিফ থেকে পাবলিক গ্রিফে রূপান্তর।”
ফজলুর রহমানের সেই অটল উচ্চারণ—এই দেশে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় গেলে তিনি তা নিজের অস্তিত্ব দিয়েই প্রত্যাখ্যান করবেন—এই অর্জুনীয় শপথেরই আধুনিক প্রতিধ্বনি। এটি ছিল এক ব্যক্তির নৈতিক অবস্থান, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিবেকেও প্রতিফলিত হয়েছে।
আমি স্রোতের বিরুদ্ধে বুক টান টান করে দাঁড়ানো এক অকুতোভয় বীরকে দেখেছি।
আমি বাংলার এক ভূমিপুত্রকে দেখেছি।
আমি এক মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি।
আমি ফজলুর রহমানকে দেখেছি—আর তাঁর ভেতর দিয়েই দেখেছি একাত্তরকে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের প্রতি আনত মস্তকে শ্রদ্ধা।