এবারও বাড়েনি ‘বিশেষ ট্রেন’, ভোগান্তির আশঙ্কা
ঈদ ঘিরে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিতে প্রতিবছরই ‘বিশেষ ট্রেন’ পরিচালনা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঈদযাত্রায় বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কখনো একরকম থাকে না। প্রতিবারই সেটা ওঠানামা করে, অর্থাৎ কম-বেশি হয়। আসন্ন ঈদুল ফিতরের ঈদযাত্রায় বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি। গত বছরের মতোই রাখা হয়েছে পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেন।
বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কম থাকায় ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে বলে মনে করছেন সাধারণ যাত্রীরা। তারা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে ট্রেনে এমনিতেই যাত্রীচাপ বাড়ে। শেষ মুহূর্তে এত বেশি ভিড় হয় যে, টিকিট সংগ্রহ করা যাত্রীরাও অনেক সময় নিজ আসন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না৷ শেষ মুহূর্তের ঈদযাত্রায় ছাদেও ভ্রমণ করতে দেখা যায়। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার স্পেশাল ট্রেনের সংখ্যা কমানোর কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।
রেল কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে ঈদের ছুটিতে ভিন্নতা আসায় স্পেশাল ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা কমেছে৷ এছাড়া লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন সংকটের কারণে অনেক ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। সব দিক বিবেচনা করে এবারও বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কমেছে৷
তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলে সময় উপযোগী পরিকল্পনার অভাবে কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা মিলছে না৷ একদিকে যাত্রীসংখ্যা যেমন বাড়ছে বিপরীতে কমানো হচ্ছে ট্রেন সংখ্যা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২২ সালে ঈদুল ফিতরে ৬ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হয়েছিল। এসব ট্রেন তখন চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, খুলনা-ঢাকা-খুলনা, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার ও ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রুটে চলাচল করে।
২০২৩ সালের ঈদুল ফিতরে বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা ছিল ৯ জোড়া। সেবার চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ, চাঁদপুর-সিলেট-চাঁদপুর, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ, জয়দেবপুর-পঞ্চগড়-জয়দেবপুর ও ঢাকা-চিলাহাটি-ঢাকা রুটে এসব ট্রেন পরিচালনা করা হয়।
২০২৪ সালে ৮ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হয়। সেগুলো চাঁদপুর-চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে চলাচল করে।
সবশেষ ২০২৫ সালে সংখ্যা কমিয়ে ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হয়। এসব ট্রেন চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ এবং জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে চলাচল করে। ২০২৬ সালের ঈদযাত্রায়ও ৫ জোড়া স্পেশাল ট্রেন চলাচল করবে।
এবার ঈদে যেসব রুটে চলবে বিশেষ ট্রেন
চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে চাঁদপুর ঈদ স্পেশাল-১ এবং ২; ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা রুটে তিস্তা স্পেশাল-৩ এবং ৪; ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার রুটে শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৫ এবং ৬; ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রুটে শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৭ এবং ৮; জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে পার্বতীপুর ঈদ স্পেশাল-৯ এবং ১০ ট্রেন পরিচালনা করা হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, গত ঈদে ৫ জোড়া স্পেশাল ট্রেন ছিল, এবার একই সংখ্যক ট্রেন রাখা হয়েছে। কয়েক বছর আগেও ঈদে চাহিদা বেশি ছিল, তখন স্পেশাল ট্রেনের সংখ্যাও বেশি রাখা হতো। কিন্তু গত বছর থেকে ঈদের ছুটি বেড়েছে, যাত্রীরা ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন। এর ফলে বাড়তি ট্রেনের চাহিদা কিছুটা কম। এছাড়া আমাদের লোকোমোটিভ (ট্রেনের ইঞ্জিন) সংখ্যা কম, এজন্য স্পেশাল ট্রেনের সংখ্যা কমানো হয়েছে৷
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ও অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ হলেও পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে পরিবহনের সক্ষমতা বাড়েনি৷ রেলের লোকোমোটিভ, কোচ যে পরিমাণে দরকার সেগুলো বাড়েনি। ঈদকেন্দ্রিক নিম্নআয়ের মানুষের বাড়ি ফেরার মূল মাধ্যম ট্রেন। বাসের ভাড়া বেশি, এজন্য তুলনামূলকভাবে ট্রেনের চাহিদা অনেক।
তিনি বলেন, দু-তিন বছর আগেও ঈদে যেখানে ১০ জোড়া স্পেশাল ট্রেন থাকতো, লোকোমোটিভ ও কোচ সংকটের কারণে সেটি কমে ৫ জোড়ায় এসেছে। ঢাকা শহরে মানুষ বাড়ছে, কর্মসংস্থানের জন্য মানুষ ঢাকায় আসে। ঈদে সবাই বাড়ি ফিরতে চায়। এসময় ট্রেনের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। কিন্তু ট্রেনের সংখ্যা কমেছে। অর্থাৎ, চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, সেটি আরও বাড়ছে।
‘রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্টেশনে অবৈধ যাত্রী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু যখন পোশাক কারখানা ও অন্য কর্মস্থলগুলোতে একযোগে ঈদের ছুটি শুরু হয় তখন ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ সামাল দেওয়া খুবই কঠিন। তখন কিন্তু এসব পদক্ষেপ আর কাজ করবে না। লোকজন পারলে ট্রেনের ছাদে উঠে যাবে।’
ড. হাদিউজ্জামান বলেন, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের বাইরে যেসব যাত্রীদের কাছে টিকিট থাকবে ভিড় ঠেলে নির্দিষ্ট ট্রেনের আসন পর্যন্ত পৌঁছুনো তাদের জন্য এবার আরও কষ্টকর হতে পারে।
রেলওয়ে অনেকগুলো বিলাসী প্রকল্প করেছে। কিন্তু যেসব জায়গায় ঘাটতি সেখানে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এখনো ইঞ্জিন ও কোচের ঘাটতি রয়ে গেছে। মেয়াদউত্তীর্ণ ইঞ্জিনে জোড়াতালি দিয়ে চলছে অনেক ট্রেন। এসব খাতে সবার আগে বিনিয়োগ করা উচিত ছিল। সব মিলিয়ে পরিকল্পনায় ত্রুটি ছিল’—যোগ করেন এ যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।