জ্বালানি তেলের অভাবে থমকে গেছে মতি মৃধাদের জীবন
‘বাসার সামনে গাড়ি হালাইয়া (ফেলে) রাখছি। ১৫-১৬ দিন ধইরা কোনো কিস্তি বাদাও দেতে পারি না। পরিবার লইয়া এহন কি খামু? অনেক কষ্টে আছি। মোটরসাইকেল পাম্পে নেতে ৫০০ টাহা খরচ হয়। কিন্তু তেল পামু (পাই) ২০০ টাহার। অটোরিকশায় তিন দিন পাম্পে গেছি কিন্তু তেল পাই নাই। এহন প্রায় না খাইয়া মরার পালা। কিন্তু কিস্তিয়ালারা হেই কথা হোনে না।’
কথাগুলো বলছিলেন, বরগুনা সদর উপজেলার কালিরতবক এলাকার বাসিন্দা মো. মতি মৃধা। তিনি একজন ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক। পেশা হিসেবে মোটরসাইকেল চালিয়েই পরিবারের পাঁচ সদস্যের ভরণপোষণ চালালেও জ্বালানি সংকটে এখন তার আয় প্রায় বন্ধের পথে। ফলে বর্তমানে এক প্রকার বেকার হয়ে পড়েছেন তিনি। শুধু মতি মৃধা একাই নন, বরগুনার অধিকাংশ ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল চালকদেরই এখন প্রায় একই অবস্থা।
সরেজমিনে কালিরতবক এলকার মোটরসাইকেল চালক মতি মৃধার বাড়ি ঘুরে দেখা যায়, একমাত্র আয়ের মাধ্যম মোটরসাইকেলটি ঘরের সামনে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। তেল না থাকায় মোটরসাইকেল চালিয়ে পাম্পে নিয়ে যেতে পারছেন না তিনি। আবার মোটরসাইকেলছাড়া বোতল নিয়ে পাম্পে গিয়েও সহজে মিলছে না জ্বালানি তেল। এ অবস্থায় মোটরসাইকেল চালাতে না পারায় পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। এ ছাড়া, নিয়মিত কিস্তির টাকাও পরিশোধ করতে পারছেন না তিনি। কিস্তি নিতে আসা কর্মীদের সঙ্গে প্রায় সময়ই বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন মতি মৃধা।
মতি মৃধার স্ত্রী মোসা. পারুল গণমাধ্যমকে বলেন, আমার স্বামী মোটরসাইকেল চালিয়ে পরিবারের পাঁচ সদস্যের ভরণপোষণ চালান। কিন্তু অনেকদিন ধরে তেল সংকটের কারণে মোটরসাইকেল বাড়িতে পড়ে আছে। এক ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে, প্রতিদিন তাকে ২০-৩০ টাকা খরচ দিতে হয়। কিস্তির টাকা নিতে আসলে দিতে না পারায় তাদের কথা শুনতে হয়। ঘরে বাজার নাই। আমরা কারো কাছে কিছু চাইতেও পারি না। আর কেউ কোনো সহযোগিতাও করে না। কারণ সবাই জানে আমরা ভালো আছি। কিন্তু এখন যে আমাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে, তা তো কেউ জানে না। আল্লাহ আমাদের হাত-পা দিয়েছে, আমরা কাজ করেই খেতে চাই। আমরা চাই দ্রুত তেলের সমস্যা সমাধান হোক।
বরগুনা সদর উপজেলা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে প্রতিদিন শতশত ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল চলাচল করে। পৌরশহরসহ আশপাশের ৪-৫টি মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড থেকে এসব মোটরসাইকেল চলাচল করে। প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মোটরসাইকেল চালকরা যাত্রী পরিবহন করলেও এখন মাত্র দুই থেকে তিনটি ট্রিপের পরেই জ্বালানি সংগ্রহে দীর্ঘ লাইনে সময় পার করতে হচ্ছে এসব চালকদের। এ ছাড়া, জ্বালানি তেলের সংকটে কমতে শুরু করেছে স্ট্যান্ডগুলোতে থাকা মোটরসাইকেলের সংখ্যা। এতে আয় কমে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন বরগুনার অধিকাংশ ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল চালকরা।
বরগুনা পৌরশহরের মাদ্রাসা সড়ক নামক এলাকার বরগুনা-চালিতাতলীগামী মোটরসাইকেল স্ট্যান্ডের ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলচলাক মো. সোহরাব শরীফ গণমাধ্যমকে বলেন, মোটরসাইকেলে যে তেল ছিল তা দিয়ে একবার যাত্রী নিয়ে চালাতে পেরেছি। এরপর তেলের পাম্পে গিয়ে শুনি তেল নাই। এখন মোটরসাইকেল নিয়ে বসে আছি। কখন পাম্পে তেল আসবে, আর কখন তেল পাবো তা জানি না।
মো. মিরাজ মিয়া নামে ওই স্ট্যান্ডের আরেক ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলচালক গণমাধ্যমকে বলেন, তেলের সংকটের কারণে আমদের আগের মতো আর ইনকাম নেই। মানুষের কাছে ভাড়া বেশি চাইতেও পারি না। এখন যে ইনকাম তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। তেল সংকটে অনেকেরই এখন মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ হয়ে গেছে।
মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড কমিটির সভাপতি মো. আব্দুর রহিম গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের অনেকেরই বাড়ি জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে এসে তেল নিতে হয়। এ ছাড়া, পাম্পে অধিকাংশ সময়ই সন্ধ্যার পরে তেল দেওয়া শুরু করে। লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে তেল পাই মাত্র ২০০ টাকার। পরে সকালে যাত্রী নিয়ে মাত্র দুইবার আসা-যাওয়া করলেই তেল শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় আমাদের মোটরসাইকেল চলাকদের জন্য সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাওয়া ব্যবস্থা করলে চালকদের উপকার হবে।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সজল চন্দ্র শীল গণমাধ্যমকে বলেন, জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি করাসহ বরগুনা সদর উপজেলায় ফুয়েল কার্ড চালু করা হয়েছে। অন্যান্য উপজেলায়ও ফুয়েল কার্ড চালুর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মানুষ যাতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে জ্বালানি তেল পেতে পারে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক লোক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একাধিকবার যাতে তেল সংগ্রহ করতে না পারে সে বিষয়টিও আমরা নিশ্চিত করেছি। আমদের প্রতিটি উপজেলায় ট্যাগ অফিসার রয়েছে, পাশাপাশি মনিটরিং টিমসহ জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা মনিটরিং করছেন।
ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল চলাকদের বিষয়ে তিনি বলেন, যারা ভাড়ায় মোটরসাইকেল চলাক আছেন, তাদের সমস্যার বিষয়ে আমাদেরকে জানালে তাদেরকে নিয়ে বসে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।