নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহ প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণে প্রকৌশলী নিয়োগে ৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব
বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান লোকোমোটিভের সংখ্যা ২৯৬টি। এর মধ্যে ১৬৮টি মিটার গেজ এবং ১২৮টি ব্রড গেজ। মেকানিক্যাল কোড এবং ডিজাইন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর। কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ের ১১৮টি (৭০%) মিটার গেজ লোকোমোটিভের আয়ু এরই মধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এছাড়া ৬৩টি (৩৮%) মিটার গেজ লোকোমোটিভের বয়স ৪০ বছর পেরিয়েছে।
রেলকে সচল রাখতে জরাজীর্ণ ও পুরোনো রেল ইঞ্জিন বদলে নতুন লোকোমোটিভ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে
বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বহু পুরনো, যার ফলে সরকারের শত শত কোটি টাকা লুটপাট করে লোকোমোটিভ দপ্তরের প্রকৌশলীরাসহ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এসব ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক মামলা করেছে এবং অভিযান পরিচালনা করেছে। এবারও সেই পথে হাঁটার ছক কষছে রেলওয়ের বর্তমান যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) মো: বোরহান উদ্দিন।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, জরাজীর্ণ ও পুরোনো রেল ইঞ্জিন বদলে নতুন লোকোমোটিভ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। তবে প্রকল্পের একটি ব্যয় প্রস্তাব ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। ৩০টি মিটার গেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাত্র দুই বিদেশি প্রকৌশলী নিয়োগে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছে যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) মো: বোরহান উদ্দিন। এই বিপুল ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের মতে, বিদেশি প্রকৌশলীর পেছনে এত অর্থ খরচ না করে দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিলে দীর্ঘমেয়াদে রেলখাত আরও দক্ষ ও স্বনির্ভর হয়ে উঠবে এমনটা আশা তাদের।
জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটার গেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে রেলওয়ে। এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ক্রয়কৃত ৩০টি লোকোমোটিভ পাঁচ বছর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে দুজন বিদেশি সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয় রাখা হয়েছে। যা রীতিমতো অবাক করেছে পরিকল্পনা কমিশনকে।
তবে—দুই প্রকৌশলীর পেছনে এত টাকা ব্যয় প্রস্তাবে খোদ প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে এই অযৌক্তিক ব্যয়ের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে রেলের যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) মো: বোরহান উদ্দিনের কাছে। দুজন প্রকৌশলীর জন্য এত বেশি ব্যয়ের বিরোধিতা করে ভিন্ন যুক্তি দেখিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।
এদিকে বিদেশি দুই প্রকৌশলীর জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয় না করে দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়ে মত দিয়েছে কমিশন। কমিশন বলছে, ২০ জন দেশি প্রকৌশলীকে জার্মানি অথবা উন্নত কোনো দেশে প্রশিক্ষণ দিলে ৫০ কোটি টাকা খরচ হবে না। পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলী রেলখাতে দীর্ঘদিন সেবা দেওয়ার পাশাপাশি তারাও উন্নত জনবল তৈরি করতে সক্ষম হবে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্মপ্রধান (রেল পরিবহন উইং) মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, একটি প্রস্তাবিত প্রকল্পে দুই প্রকৌশলীর জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয় চাওয়া হয়েছে, এটা অনেক ব্যয়, এটা আমাদের পর্যবেক্ষণে আছে। এতদিন এটা চলে আসছে। এটা আমরা ধরেছি। তবে রেল মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের লোক নেই।
তিনি বলেন, দরকার পড়লে বিদেশে ট্রেনিং দিয়ে রেল মেরামতের প্রকৌশলী তৈরি করতে হবে। আমি ২০ জনকে ২০ দিন জার্মানিতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করলে এত টাকা খরচ হবে না। এতে করে দেশীয় প্রকৌশলী আমাদের অ্যাসেট হবে। এই অ্যাসেট ৩০ বছর দেশকে সাপোর্ট দেবে।
মোহাম্মদ আশরাফুল আরও বলেন, দরকার হয় ট্রেনিং খাতে বরাদ্দ রাখবো, কিন্তু দুই বিদেশি প্রকৌশলীর জন্য ৫০ কোটি বরাদ্দ রাখবো না। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লোকোমোটিভের বিষয়ে নলেজ শেয়ার করা যাবে। আলাদা ৫০ কোটি টাকা রাখতে দেবো না। আমরা প্রতিটি আইটেম নিয়ে কথা বলবো। একটি টাকাও বাড়তি ব্যয় করতে দেবো না।
এ বিষয়ে রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) মো. বোরহান উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা দুজন প্রকৌশলীর ব্যয় ৫০ কোটি টাকা ধরেছি। তবে এটা চাওয়া হয়েছে, রাখার দায়িত্ব পরিকল্পনা কমিশনের। পরিকল্পনা কমিশন যেভাবে বলবে আমরাও সেভাবে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রস্তুত করবো। এটা নিয়ে সামনে সভা হবে, সেই সভায় সবকিছু বিস্তারিত আলোচনা হবে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ’ প্রকল্পের মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ২ হাজার ৮২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ঋণ দেবে ১ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। বাকি ৮২৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা সরকারি খাত থেকে মেটানো হবে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৯ নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের নানা খাতে বাড়তি ব্যয় চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পে টেস্টিং ফি বাবদ ৭৫ লাখ, ট্রান্সপোর্ট চার্জ বাবদ ৭৫ লাখ, ব্যাংক চার্জ (৩%) বাবদ ৫৫ কোটি ৬ লাখ ৫৩ হাজার, পোর্ট চার্জ বাবদ ১ কোটি ৫০ লাখ, ভ্রমণ ব্যয় ২০ লাখ ও সার্ভে বাবদ ৭৫ লাখ টাকার ব্যয় প্রস্তাবের যৌক্তিক ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিশন।
এছাড়া স্থানীয় প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে কমিশন। এছাড়া প্রতিটি প্রশিক্ষণের নাম, মেয়াদকাল, সংখ্যা ও ব্যয় প্রাক্কলন উল্লেখসহ প্রশিক্ষণের মোট ব্যয় প্রাক্কলন করতে হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি লোকোমোটিভের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৮ কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা (সিডি-ভ্যাটসহ)। প্রস্তাবিত ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি এবং অন্য প্রকল্পের আওতায় কেনা লোকোমোটিভের ব্যয় প্রাক্কলনের সঙ্গে প্রস্তাবিত ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করতে হবে বলে জানায় কমিশন।
তবে ভিন্ন কথা বললেন রেলওয়ের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রেলওয়েতে সবসময় লোকসান লেগেই থাকে, এখানে লোকসান কেন হয় আপনি আমি দেশের প্রতিটি মানুষ জানে, প্রকল্পের নামে বড় বড় দুর্নীতি হয় এখানে, কেনাকাটা বলেন, সংস্কার বলেন, রক্ষাণাবেক্ষণ বলেন সব জায়গায় দুর্নীতির গন্ধ লেগেই থাকে। সুতারাং নতুন নতুন প্রকল্প মানে দুর্নীতির মেশিন সচল রাখা। এখান থেকে বের হওয়া কখনো সম্ভব নয়।
এছাড়া—প্রকল্প সমাপ্তির পরবর্তী ৫ বছরের জন্য স্পেয়ার পার্টস বাবদ ৪৬৯ কোটি ৫৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকার থোক রাখা হয়েছে। এ ব্যয় প্রস্তাবের ও যৌক্তিকতা জানতে চেয়েছে কমিশন। স্পেয়ার পার্টসের ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি, নির্ভরযোগ্য বাজার দর, ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির প্রকাশিত দর, অন্যান্য প্রকল্পের তুলনামূলক দরের আলোকে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী স্পেয়ার পার্টসের নাম, সংখ্যা, পরিমাণ ও একক দর উল্লেখপূর্বক ব্যয় প্রাক্কলন করতে হবে বলে সাফ জানিয়েছে কমিশন।
রেলওয়ে জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান লোকোমোটিভের সংখ্যা ২৯৬টি। এর মধ্যে ১৬৮টি মিটার গেজ এবং ১২৮টি ব্রড গেজ। মেকানিক্যাল কোড এবং ডিজাইন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর। কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ের ১১৮টি (৭০%) মিটার গেজ লোকোমোটিভের আয়ু এরই মধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এছাড়া ৬৩টি (৩৮%) মিটার গেজ লোকোমোটিভের বয়স ৪০ বছর পেরিয়েছে।
এসআইএল/বিবিএন