এক বিশ্বকাপের মহাকাব্য : জাস্টিন ফন্টেইন ও অমর ‘১৩’

A World Cup epic: Justin Fontaine and the immortal '13'
অনলাইন ডেস্ক ১৩ জুন ২০২৬ ০৫:২৬ অপরাহ্ন বিশ্বকাপ আপডেট
অনলাইন ডেস্ক ১৩ জুন ২০২৬ ০৫:২৬ অপরাহ্ন
এক বিশ্বকাপের মহাকাব্য : জাস্টিন ফন্টেইন ও অমর ‘১৩’
সংগৃহীত ছবি

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু রেকর্ড থাকে যা ভাঙা তো দূরের কথা, স্পর্শ করার কথা ভাবলেও সম্ভবত আধুনিক স্ট্রাইকারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। ঠিক তেমনি এক ‘অবাস্তব’, অবিশ্বাস্য রেকর্ডের মহানায়ক ফরাসি কিংবদন্তি জাস্টিন ফন্টেইন। ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে মাত্র একটি টুর্নামেন্টে ১৩টি গোল করেছিলেন তিনি। প্রায় সাত দশক পার হতে চললেও এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলের এই রেকর্ড আজও অক্ষত এবং ফুটবল বোদ্ধাদের মতে– এটি হয়তো চিরকালই অমর হয়ে থাকবে।

আজকের ফুটবল দুনিয়ায় যেখানে সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা, ডাটা অ্যানালাইসিস আর উন্নত বুট ব্যবহার করেও এক বিশ্বকাপে ৫-৬টি গোল করতেই স্ট্রাইকারদের ঘাম ছুটে যায়, সেখানে ১৯৫৮ সালে ফন্টেইন যা করেছিলেন, তা স্রেফ রূপকথা।


১৯৩৩ সালের আগস্টে মরক্কোর মারাকেশে জন্ম নেওয়া ফন্টেইনের ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ক্যাসাব্লাঙ্কায়। পরে ফ্রান্সের ক্লাব নিস ও রেঁসের হয়ে বুন্দেসলিগা ও ফরাসি লিগে তিনি গোলের বন্যা বইয়ে দেন। রেঁসের হয়ে তিনবার ফরাসি লিগ এবং ১৯৫৯ সালের ইউরোপিয়ান কাপের (বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) ফাইনালে ওঠার কৃতিত্ব রয়েছে তার। তবে ক্লাব ক্যারিয়ার ছাপিয়ে তিনি অমর হয়ে আছেন ১৯৫৮ সালের জুনের সেই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের কারণে।

অথচ বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্সের মূল দলেই থাকার কথা ছিল না তার। সতীর্থ রেনে ব্লিয়ার্ড ইনজুরিতে পড়ায় শেষ মুহূর্তে দলে সুযোগ পান ফন্টেইন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সেই বিশ্বকাপে নিজের বুট জোড়াও সাথে ছিল না তার! সতীর্থ স্তেফান ব্রুইয়ের কাছ থেকে একজোড়া বুট ধার করে খেলতে নেমেছিলেন তিনি। আর ধার করা বুট পায়ে দিয়েই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছিলেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে শুরু। এরপর যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ২টি, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১টি, কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২টি এবং সেমিফাইনালে পেলের ব্রাজিলের বিপক্ষে ১টি গোল করেন। তবে আসল ধামাকাটা জমিয়ে রেখেছিলেন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের জন্য। পশ্চিম জার্মানির মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে একাই ৪ গোল করে ফ্রান্সকে ৬-৩ ব্যবধানে জেতান এবং নিজের নামের পাশে লিখে নেন টুর্নামেন্টের ১৩তম গোল। মাত্র ৬ ম্যাচে ১৩ গোল– ভাবা যায়!


ফন্টেইন শুধু গোলশিকারি ছিলেন না; তিনি ছিলেন গতি, নিখুঁত টাইমিং ও দুই পায়ে সমান দক্ষ এক পূর্ণাঙ্গ স্ট্রাইকার। দুঃখজনকভাবে, এই মহানায়কের ক্যারিয়ার দীর্ঘ হতে পারেনি। মাত্র ২৬ ও ২৭ বছর বয়সে দুবার পা ভেঙে যাওয়ার কারণে ১৯৬২ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে ফুটবলকে বিদায় জানাতে বাধ্য হন তিনি। ফ্রান্সের হয়ে মাত্র ২১ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা ৩০টি!

২০০৪ সালে পেলের নির্বাচিত জীবন্ত সেরা ১২৫ জন ফুটবলারের তালিকায় ফন্টেইন স্থান পেয়েছিলেন। ২০১৩ সালে ফিফা তাকে বিশেষ 'গোল্ডেন বুট' দিয়ে সম্মানিত করে। ২০২৩ সালের ১ মার্চ, ৮৯ বছর বয়সে ফুটবল বিশ্বকে কাঁদিয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি।

তিনি ১৯৬৭ সালে কিছুদিনের জন্য ফ্রান্স জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র দুটি প্রীতি ম্যাচে হেরে যাওয়ার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। মরক্কোর কোচ হিসেবে তিনি 'অ্যাটলাস লায়ন্স'দের ১৯৮০ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে তৃতীয় স্থান এনে দিয়েছিলেন। তার অধীনেই বাদৌ জাকি, মোহাম্মদ তিমুমি এবং আজিজ বাউদারবালার মতো তারকা খেলোয়াড়দের উত্থান ঘটেছিল।


১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে মরক্কো পৌঁছালেও ক্যামেরুনের কাছে তারা হেরে যায়। এছাড়া, প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে তিনি ক্লাবটিকে প্রথম বিভাগে (শীর্ষ লিগে) উঠতে সাহায্য করেছিলেন।

তবে ফন্টেইনকে নিয়ে লিখতে গেলে জাদুকরী সেই সংখ্যার কাছেই বারবার ফিরে আসতে হয়—১৩। ফুটবল ইতিহাসে পেলের পাসের সৌন্দর্য, ম্যারাডোনার ড্রিবলিং বা মেসির পায়ের জাদু যেমন চিরস্মরণীয়, ঠিক তেমনি বিশ্বকাপের মঞ্চে ফন্টেইনের গোলক্ষুধা ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় এক অবিনশ্বর অধ্যায়।

সূত্রঃ ঢাকা পোস্ট

এসআইএল/বিবিএন