অসময়ে মাচায় ঝুলছে হাজারো তরমুজ
বর্ষাকাল এলে অধিকাংশ নিচু জমিই পানিতে তলিয়ে যায়, সেসব জমি পতিত রাখেন অনেক কৃষকই। কিন্তু কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার কৃষক আলাউদ্দিন বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। কৃষি বিভাগের পরামর্শ, নিজের সাহস আর পরিশ্রমকে পুঁজি করে তিনি অফ-সিজনে তরমুজ চাষ করে তাক লাগিয়েছেন সবাইকে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে বড় বড় তরমুজ, আর সেই বাগান দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন আশপাশের কৃষক ও ফলপ্রেমীরা। বাজারে অসময়ের তরমুজের ব্যাপক চাহিদা থাকায় খরচ উঠিয়ে দুই থেকে তিনগুণ লাভের স্বপ্ন দেখছেন এই উদ্যোমী কৃষক।
জানা গেছে, উপজেলার চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের ঘাগড়া গ্রামের বাসিন্দা আলাউদ্দিন। গতবার অল্প জমিতে তরমুজের চাষ করে লাভবান হওয়ায় এ বছর ৮০ শতক জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। এতে তার জমিতে ভালো ফলন এসেছে।
সরেজমিনে কৃষক আলাউদ্দিনের তরমুজ বাগানে গিয়ে দেখা গেছে, মালচিং পদ্ধতিতে মাচায় তরমুজের আবাদ করা হয়েছে। সবুজ পাতার ফাঁকে মাচায় ঝুলছে অসংখ্য তরমুজ। আকারে বড় হওয়ায় মাটিতে যেন পড়ে না যায় সেজন্য প্রতিটি তরমুজ জালি দিয়ে মাচার সঙ্গে বেধে রাখা হয়েছে। প্রতিটি গাছে ৩-৪টি করে তরমুজ ধরে আছে। একেকটি তরমুজ ৪ থেকে ৫ কেজি ওজনের।
জমিতে পরিচর্যা করছিলেন তরমুজ চাষি আলাউদ্দিন। আলাপকালে তিনি জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শে গত বছর ২০ শতক জমিতে প্রথমবার তরমুজ চাষ করেছিলাম। প্রথমবারেই ভালো ফলন পেয়েছিলাম। বাজারে অসময়ের তরমুজের চাহিদা থাকায় ভালো লাভ পেয়েছিলাম। তাই এ বছর ৮০ শতক জমিতে তরমুজের চাষ করেছি। আল্লাহর রহমতে ভালো ফলন এসেছে। মে মাসের শুরুতে ব্ল্যাককুইন জাতের তরমুজ রোপণ করি। বর্তমানে হারভেস্টারের (কর্তন) অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিটি তরমুজ চার থেকে পাঁচ কেজি ওজনের। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে বিক্রির উপযোগী হবে।
তিনি আরও জানান, ধান চাষে লাভ কম পাওয়া যায়। তাছাড়া এই বর্ষায় নিচু জমিতে পানি জমে থাকে। তাতে অন্য ফসল করা লোকসান। তাই এই সময়টাতে অন্য ফসল না করে তরমুজের চাষ করি। এতে অল্প সময়ে কম খরচে অধিক লাভবান হওয়া যায়।
আলাউদ্দিন বলেন, ৮০ শতক জমিতে আমার লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। পাইকাররা এসে দরদাম করছেন। প্রতি কেজি তরমুজ পাইকারি ৫০ টাকা। এই অনুপাতে যে ফলন এসেছে তাতে আমার খরচ উঠে দুই থেকে তিনগুণ লাভ হবে বলে আশা করছি।
কৃষক আলাউদ্দিনের তরমুজ চাষে সফলতা দেখে গ্রামের অন্য কৃষকেরাও তরমুজ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাকে দেখে একই গ্রামের সুমন, কাইয়ুমসহ অনেকে তরমুজ চাষ শুরু করেছেন। প্রতিদিন আলাউদ্দিনের তরমুজ বাগানে ভিড় করছেন উৎসুক কৃষক ও ফলপ্রেমীরা।
একই গ্রামের সুমন মিয়া বলেন, তরমুজ চাষ লাভজনক। কম সময় ও খরচে অধিক লাভ পাওয়া যায়। তাই আমিও তরমুজের চাষ করেছি। মাস খানেকের মধ্যে আমার বাগানের তরমুজ বিক্রির উপযোগী হবে।
কাইয়ুম মিয়া বলেন, আলাউদ্দিন চাচার তরমুজ বাগান দেখে আমিও উৎসাহ পেয়েছি। এই বর্ষায় জমি পতিত না রেখে তরমুজ চাষের জন্য প্রস্তুত করছি। আশা করছি ভালো ফলন পাবো।
ঘাগড়া ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো.নজরুল ইসলাম বলেন, অসময়ে তরমুজ চাষ একটি লাভজনক ফসল। কৃষক আলাউদ্দিনকে উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে পর্যাপ্ত পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হয়েছে। তার জমিতে তরমুজের ভালো ফলন এসেছে। এতে তিনি আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হবেন। তার সফলতা দেখে গ্রামের অন্য কৃষকেরাও তরমুজ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূরে-আলম বলেন, কম সময় ও খরচে তরমুজ চাষে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে তাই নিচু জমি পতিত না রেখে তারা সেই জমিতে তরমুজের আবাদ করে ভালো ফলন পাচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে তরমুজের ব্যাপক চাহিদা থাকায় তারা আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, এ উপজেলায় এই সময়ে ৩০ বিঘা জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে অনেক জমির তরমুজ বিক্রির উপযোগী হবে। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের পর্যাপ্ত পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।