খালাসের রায়ে ন্যায়বিচার না পাওয়ার অভিযোগ বিচারপ্রার্থীদের

Allegations of lack of justice in acquittal verdict
ছোটন সরদার ১৪ জুলাই ২০২৬ ১২:১৪ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
ছোটন সরদার ১৪ জুলাই ২০২৬ ১২:১৪ অপরাহ্ন
খালাসের রায়ে ন্যায়বিচার না পাওয়ার অভিযোগ বিচারপ্রার্থীদের
তানোর উপজেলার আলোচিত এক ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত যাজক প্রদীপ গ্রেগরীর খালাসের রায়ের পর ন্যায়বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী পরিবার।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার আলোচিত এক ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত যাজক প্রদীপ গ্রেগরীর খালাসের রায়ের পর ন্যায়বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী পরিবার। রায় ঘোষণার পর বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তানোর উপজেলার মুণ্ডুমালা মাহালীপাড়া এলাকার এক কিশোরী বাড়ির পাশের সাধুজন মেরী গির্জার কাছে ঘাস কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হন। পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর তার বড় ভাই স্বপন হাঁসদা তানোর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরিবারের সদস্যরা খ্রিস্টান ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নিজেদের মধ্যে প্রার্থনা করেন এবং মিশনের গির্জায়ও প্রার্থনার অনুরোধ জানান।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মিশনে কর্মরত জার্সি মুর্মু নামে এক ব্যক্তি তাদের জানান, নিখোঁজ কিশোরী তৎকালীন যাজক প্রদীপ গ্রেগরীর কক্ষে রয়েছেন। এ খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা সেখানে গেলে তারা কিশোরীকে নিয়ে আসতে চাইলে বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ করেন।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টায় মিশন কর্তৃপক্ষ একটি সালিশের আয়োজন করে। পরিস্থিতির কারণে তারা সেই সালিশে অংশ নিতে বাধ্য হন। সালিশ পরিচালনা করেন সহকারী যাজক প্যাট্রিক গোমেজ। তাদের দাবি, রাজশাহী ডায়োসিসের তৎকালীন বিশপ জেরভাস রোজারিওর নির্দেশে যাজক পল গোমেজ ও ইম্মানুয়েল কানন রোজারিওও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

বাদী স্বপন হাঁসদার দাবি, সালিশে তাদের পক্ষের বক্তব্য গুরুত্ব পায়নি। তিনি বলেন, তার বোনের লেখাপড়া, ভরণ-পোষণ এবং বিয়ে পর্যন্ত সব দায়িত্ব নেওয়ার মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও লিখিত কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে মিশন কর্তৃপক্ষ রাজি হয়নি। একই সঙ্গে কিশোরীকে পরিবারের কাছে না দিয়ে মিশনেই রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। এসব শর্তে পরিবার রাজি হয়নি।

পরিবারের দাবি, লিখিত নিশ্চয়তা চাইলে মিশন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় কিছু খ্রিস্টান তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং সামাজিকভাবে বয়কটের হুমকি দেয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ গির্জা থেকে কিশোরীকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। ওই রাতেই কিশোরীর বক্তব্যের ভিত্তিতে তার বড় ভাই স্বপন হাঁসদা তানোর থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার বিচার চলাকালে ১৮ থেকে ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। বাদীপক্ষের দাবি, ভুক্তভোগী প্রথমে আদালতে হাজির হয়ে অভিযোগের পক্ষে জবানবন্দি দেন এবং জানান, তাকে তিন দিন যাজকের কক্ষে আটকে রেখে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়েছে।

তবে পরবর্তী সময়ে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে ভুক্তভোগী আদালতে ভিন্ন বক্তব্য দেন। এ বিষয়ে বাদীপক্ষের অভিযোগ, সামাজিক চাপ ও বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার কারণে তাকে পূর্বের বক্তব্য অস্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে আদালতে পুনরায় হাজির হয়ে তিনি তার প্রথম বক্তব্যই সত্য বলে দাবি করেন।

স্বপন হাঁসদা অভিযোগ করেন, মামলার সময় তিনি পাবনায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকায় তার পরিবারকে সামাজিকভাবে নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি যারা প্রথমে পুলিশের কাছে এক ধরনের সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, পরে আদালতে এসে ভিন্ন সাক্ষ্য দেন।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করার চেষ্টা করা হয় এবং গ্রাম থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তারা দাবি করেন, সরকারি খাসজমিতে বসবাস করার কারণেই মামলা চালিয়ে যেতে পেরেছেন।

বাদীপক্ষ আরও অভিযোগ করেছে, স্থানীয় কিছু ব্যক্তি মিশন কর্তৃপক্ষের প্রভাবে বা অন্য কারণে অভিযুক্তের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে এ অভিযোগের স্বতন্ত্র কোনো প্রমাণ আদালতের রায়ে উল্লেখ রয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

খালাসের রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী পরিবার জানিয়েছে, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এদিকে, বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে বাদীপক্ষ দাবি করেছে, অভিযুক্তকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনার পর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিচার দাবিতে মানববন্ধন, জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। তবে স্থানীয় কয়েকজন আদিবাসী নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বললে তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।