ইউরোপের সর্বশেষ ইসলামী দুর্গ স্পেনে কী দেখেছিলেন ইবনে বতুতা

What did Ibn Battuta see in Spain, the last Islamic fortress in Europe
অনলাইন ডেস্ক ১৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:৫৪ অপরাহ্ন ধর্ম
অনলাইন ডেস্ক ১৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:৫৪ অপরাহ্ন
ইউরোপের সর্বশেষ ইসলামী দুর্গ স্পেনে কী দেখেছিলেন ইবনে বতুতা
--সংগৃহীত ছবি

৭১১ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের মাটিতে পা রাখেন মুসলিমরা। মুসলিম সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেনের অত্যাচারী রাজা রডারিককে পরাজিত করে মুসলমানরা এই ভূখণ্ডে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করে। মুসলিম আগমনের এক দশকের মধ্যে আইবেরীয় উপদ্বীপের (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) অধিকাংশ ভূখণ্ডই তাদের অধীনে চলে আসে। এরপর সাতশো বছরের বেশি সময় মুসলমান এই ভূখণ্ড শাসন করে।

ইউরোপে ইসলামের সর্বশেষ দুর্গখ্যাত আন্দালুস বা স্পেন অঞ্চলে ভ্রমণ করেছিলেন বিশ্বখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা।

ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ

শান্ত ও নিরিবিলি তানজিয়ার শহর থেকে হজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন যুবক ইবনে বতুতা। এরপর চষে বেড়িয়েছেন প্রাচীন বিশ্বের সব মহাদেশ। একে একে ভ্রমণ করেছেন উত্তর আফ্রিকা, মিশর, হিজাজ, আরব উপদ্বীপ, ইরাক, শাম (সিরিয়া), ইরান, ভারত মহাসাগর, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন। আনাতোলিয়া, রাশিয়া, পশ্চিম আফ্রিকা ও আন্দালুসও ভ্রমণ করেন তিনি।

সুদীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছর বিশ্ব ভ্রমণের পর নিজ জন্মভূমির জন্য ব্যাকুল হয়ে অবশেষে ৭৫০ হিজরির শাবান মাসে (নভেম্বর ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দ) এই প্রবাসী পর্যটক তার শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত মরক্কোতে ফিরে আসেন।

আন্দালুসের পথে

ইবনে বতুতা যখন ইউরোপের সর্বশেষ ইসলামিক ঘাঁটি আন্দালুস ভ্রমণ করেন, তখন কাস্টিলিয়ান ক্যাথলিকদের রাজা একাদশ আলফোনসো মারা যান, যিনি কয়েক মাস ধরে জিব্রাল্টার অবরোধ করে রেখেছিলেন। তৎকালীন সময়ে জিব্রাল্টারের পতন ঘটার অর্থ ছিল সমগ্র দক্ষিণ আন্দালুসের দ্রুত পতন এবং মরক্কোর উত্তরাঞ্চলের জন্য সরাসরি হুমকি। ফলে তার মৃত্যুতে আন্দালুসবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। 

ইবনে বতুতা তার বর্ণনায় লিখেছেন: ‘অতঃপর আল্লাহ তাকে এমনভাবে ধরলেন যা সে ভাবতেও পারেনি এবং সে মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল, যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভয় পেত।’

আলফোনসোর মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রথম পেড্রো ক্ষমতা লাভ করেন, যিনি শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি তার পিতার মতো আন্দালুসের মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ ও সংঘাতে জড়াতে পছন্দ করতেন না। এই বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনটি ইবনে বতুতার ভ্রমণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে তিনি জিব্রাল্টারে প্রবেশ করতে সক্ষম হন এবং সেখানে মরক্কোর প্রাচীন সুলতানদের, বিশেষ করে মুওয়াহহিদুন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মুমিন ইবনে আলীর তৈরি করা প্রাচীন দুর্গ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখতে পান।

 জিব্রাল্টার নিরাপত্তা জোরদার

এর কয়েক দশক পর, আবু আল-হাসান আল-মারিনি এবং তার পুত্র আবু ইনান আল-মুতাওয়াক্কিল আল-মারিনি জিব্রাল্টার শহর, এর দুর্গ ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেন। এই পাহাড়কে তখন জাবালুল ফাতহ (বিজয়ের পাহাড়) বলা হতো। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই পাহাড়ের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অপরিসীম এবং এর পতন হলে মরক্কোর পতন অনিবার্য।

জিব্রাল্টার ত্যাগ করার পর ইবনে বতুতা রন্ডা শহরের দিকে রওনা হন, যা ছিল মুসলমানদের অন্যতম সুরক্ষিত দুর্গ এবং সবচেয়ে সুন্দর শহর। তখনকার সময়ে এই শহরের প্রধান সেনাপতি ছিলেন শেখ আবু আল-রবি সুলাইমান ইবনে দাউদ আল-আসকারি এবং কাজী ছিলেন ইবনে বতুতার চাচাতো ভাই ফকিহ আবু আল-কাসিম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে বতুতা। শহরের অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সেনাপতিরা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং তিনি সেখানে পাঁচ দিন অবস্থান করেন।

মালাগা শহরে...

এরপর তিনি মারবেলা শহরের দিকে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেন, যা বর্তমান স্পেনে এবং সারাবিশ্বে অন্যতম বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেখান থেকে একদল অশ্বারোহী সেনার সাথে তিনি মালাগা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কোনো এক আকস্মিক কারণে তিনি তাদের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েন।

এই পিছিয়ে পড়াই শেষ পর্যন্ত তার জীবন বাঁচায় অথবা বন্দী হওয়া থেকে রক্ষা করে। কারণ তারা যখন সুহাইল নামের একটি শহরে পৌঁছায়—যাকে ইতিহাসবিদ হুসাইন মুনিস মালাগা উপকূলে অবস্থিত স্পেনের ফুয়েনহিরোলা শহর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—তখন কাস্টিলিয়ান শত্রুরা সেখানে ওত পেতে থেকে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় তাদের একজন নিহত হয়, একজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং বাকিরা বন্দী হয়। এই ঘটনার পর ইবনে বতুতা নিরাপদে মালাগাতে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

মালাগার বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন: ‘এটি আন্দালুসের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং একটি দৃষ্টিনন্দন শহর, যা স্থল ও জলপথের সব সুবিধা দ্বারা সমৃদ্ধ। এখানে প্রচুর পরিমাণে ফলমূল ও নিয়ামত রয়েছে। আমি এখানকার বাজারে এক দিরহামের বিনিময়ে আট রতল আঙুর বিক্রি হতে দেখেছি। এখানকার ইয়াকুত পাথরের মতো লাল ডালিমের কোনো তুলনা দুনিয়াতে নেই। আর ডুমুর ও কাঠবাদাম এখান এবং এর আশপাশ থেকে পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোতে রপ্তানি করা হয়।’

মালাগার মসজিদে...

শহরটি ঘুরে দেখার সময় তিনি সেখানকার প্রধান মসজিদে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি খতিব আবু জাফর বিন আব্দুল্লাহ আল-তানজালি এবং শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জড়ো হতে দেখেন। তারা কাস্টিলিয়ান শত্রুদের হাতে বন্দী হওয়া মুসলিমদের মুক্ত করার জন্য দান ও জাকাত সংগ্রহ করছিলেন, যাদের মধ্যে কিছুকাল আগে বন্দী হওয়া সেই অশ্বারোহী সেনাদলটিও ছিল। তা দেখে তিনি খতিব ও উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বললেন: ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে সুস্থ ও নিরাপদ রেখেছেন এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত করেননি! এরপর আমি তাদের পেছনে আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি খুলে বললাম।’ মসজিদের ইমাম ইবনে বতুতার এই অলৌকিক বেঁচে যাওয়ার গল্প শুনে অত্যন্ত বিস্মিত হন এবং তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আপ্যায়ন ও সম্মান করেন।

ইবনে বতুতা মালাগা শহরে যা দেখেছিলেন তার বিবরণ দিতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর পরিচয় তুলে ধরে বলেন: ‘মালাগাতে চমৎকার সোনালী মাটির পাত্র তৈরি করা হয় এবং তা সুদূর দেশগুলোতে পাঠানো হয়। সেখানকার মসজিদের আঙিনা অত্যন্ত বিশাল ও বরকতময় এবং এর ভেতরের অংশটি সৌন্দর্যে অতুলনীয়, যেখানে দূর-দূরান্তের কমলার গাছ রয়েছে।’

আন্দালুসের দুর্গ 

মালাগা থেকে তিনি উত্তরের বাল্লাশ অভিমুখে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেন, যা বর্তমানে ভেলেজ-মালাগা নামে পরিচিত। তৎকালীন সময়ে এটি ছিল বৃহত্তর গ্রানাডার অধীনস্থ অন্যতম শহর। এরপর তিনি রওনা হন আল-হাম্মার উদ্দেশ্যে, যা একটি ছোট শহর হলেও এর মসজিদটি অত্যন্ত চমৎকার কারুকার্যময় ও চমৎকার স্থাপত্যের এবং যার নদীর তীরে একটি উষ্ণ পানির ঝরনা রয়েছে। সে সময়ে এটি গ্রানাডা থেকে এক মাইল দূরত্বে অবস্থিত ছিল।

গ্রানাডায়... 

সেখান থেকে তিনি আন্দালুসে ইসলামের শেষ রাজধানী গ্রানাডায় প্রবেশ করেন। এই শহরের বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘দুনিয়ার অন্য কোনো শহরের সাথেই এর তুলনা চলে না। এটি চল্লিশ মাইল দীর্ঘ এক পথ, যা শেনিল নদীসহ আরও অনেক নদী, বাগান, উদ্যান, কানন, প্রাসাদ ও আঙুর বাগান দিয়ে চারদিক থেকে বেষ্টিত। এখানকার অন্যতম এক বিস্ময়কর স্থান হলো আইনুদ দাম (অশ্রু ঝরণা); এটি মূলত এমন এক পাহাড়, যা উদ্যান ও বাগানে ঘেরা এবং যার কোনো দ্বিতীয় নজির কোথাও নেই।’

গ্রানাডায় প্রবেশের পর ইবনে বতুতা সেখানকার তৎকালীন বনু আহমার বংশের সুলতানের কথা উল্লেখ করতে ভুলেননি। তিনি লিখেছেন: ‘আমি যখন গ্রানাডায় প্রবেশ করি, তখন সেখানকার শাসক ছিলেন সুলতান আবু আল-হাজ্জাজ ইউসুফ বিন সুলতান আবি আল-ওয়ালিদ ইসমাইল ইবনে ফারাজ ইবনে ইসমাইল ইবনে ইউসুফ ইবনে নাসর। কিন্তু তার অসুস্থতার কারণে আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারিনি। তবে তার পুণ্যময়ী, সৎ ও মহীয়সী মাতা আমার জন্য কিছু স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়েছিলেন, যা আমার উপকারে এসেছিল।’

আলেম, সাহ্যিতিকদের সঙ্গে...

ইবনে বতুতা তার স্বভাবসুলভ অভ্যাসের অংশ হিসেবে গ্রানাডার উলামা, ফকিহ, খতিব ও সাহিত্যিকদের সাথে বিভিন্ন মসজিদে অথবা তাদের বাগানে বৈঠকে মিলিত হন। তেমনই একটি বৈঠকের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন: ‘সে সময়ের অনন্য ও বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব, জামায়াতের কাজী আবু আল-বারাকাত মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম আল-সালামি আল-বালফিকির সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি ওই দিনগুলোতে আলমেরিয়া থেকে এখানে এসেছিলেন। ফকিহ লেখক ও লেখককুলের গৌরব আবু আব্দুল্লাহ বিন আসিমের পুত্র ফকিহ আবু আল-কাসিম মুহাম্মদের বাগানে আমাদের এই সাক্ষাৎ ঘটে এবং সেখানে আমরা দুই দিন ও এক রাত অবস্থান করি।’

আন্দালুস সফরের বিবরণ ও সেখানকার তৎকালীন পরিস্থিতির বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনে বতুতা আরও বলেন: ‘এখানকার অন্যতম চমৎকার স্থান হলো আইনুদ দাম (অশ্রু ঝরণা), যা গ্রানাডার মাঠের কাছে অবস্থিত একটি পাহাড় এবং এটি বাগান ও কাননে ঘেরা, যার কোনো তুলনা মেলা ভার।’

সুফি-সাধকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ

অষ্টম হিজরি তথা চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গ্রানাডার এই বিবরণে ইবনে বতুতা একটি অনন্য তথ্য দিয়েছেন, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তা হলো, সে সময়ে পারস্য ও আনাতোলিয়া থেকে আসা বেশ কয়েকজন তুর্কি ও ফার্সি মুসলিম সুফি সাধক গ্রানাডার উপকণ্ঠে বসবাস করছিলেন এবং সেখানকার বিভিন্ন খানকাহতে ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন: ‘গ্রানাডায় বেশ কয়েকজন ভিনদেশি সুফি সাধক বসতি স্থাপন করেছিলেন, কারণ এই শহরটি দেখতে অনেকটা তাদের নিজেদের দেশের মতো ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন হাজি আবু আব্দুল্লাহ আল-সমরকান্দি, হাজি আহমদ আল-তাবরিজি, হাজি ইব্রাহিম আল-কোনায়োবি, হাজি হুসাইন আল-খোরাসানি এবং ভারতের দুই হাজি আলী ও রশিদসহ আরও অনেকে।’

সম্ভবত ক্যাথলিকদের বড় ধরনের আক্রমণের মুখে গ্রানাডাকে রক্ষা করতে এবং জিহাদে অংশ নিতেই এই সুফিদের আগমন ঘটেছিল। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ও পরকালের সওয়াবের আশায় তারা সুদূর প্রান্ত থেকে কষ্ট সহ্য করে আন্দালুসের মুসলমানদের এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়াতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে এসেছিলেন।

ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইনান তার সুবিশাল গ্রন্থ ‘আন্দালুসে ইসলামি সাম্রাজ্য’ (দওলাতুল ইসলাম ফিল আন্দালুস)-এ ইবনে বতুতার এই ভ্রমণকাহিনীকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং গ্রানাডা তথা সমগ্র আন্দালুসের পরিস্থিতি তুলে ধরতে এটি বিশেষভাবে প্রদর্শন করেছেন। তার মতে, ‘ইবনে বতুতার এই বিবরণ প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে খ্রিস্টানদের ক্রমাগত আক্রমণ ও লুণ্ঠনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও আন্দালুস ছিল একটি সমৃদ্ধ, সবুজ ও নেয়ামতে ভরপুর দেশ। সেখানে কোটি কোটি কর্মঠ ও বুদ্ধিমান মানুষ বাস করত, তাদের শিল্পকারখানা ছিল চমৎকার এবং সেখানে কবি, সাহিত্যিক ও উলামাদের বিশাল সমাবেশ ছিল, যা প্রমাণ করে যে ওই সময়েও সেখানে একটি চমৎকার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ চলছিল।’

নিজ দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত

গ্রানাডা ভ্রমণ শেষে যখন ইবনে বতুতার দেখার ও জানার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হলো, তখন তিনি নিজ দেশ মরক্কোতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্রথমে আল-হাম্মা, তারপর বাল্লাশ এবং এরপর জাকোয়ান দুর্গে পৌঁছান। এ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘এটি অত্যন্ত সুন্দর একটি দুর্গ, যেখানে প্রচুর পানি, গাছপালা ও ফলমূল রয়েছে।’ এরপর তিনি রন্ডা হয়ে বনু রিয়াহ গ্রামে যান। সেখানে পৌঁছালে গ্রামের প্রধান সম্পর্কে তিনি বলেন: ‘সেখানকার প্রধান আবু আল-হাসান আলী বিন সুলাইমান আল-রিয়াহি আমাকে তার মেহমান করেন। তিনি অত্যন্ত দয়ালু ও সজ্জন ব্যক্তিদের একজন ছিলেন, যিনি মুসাফিরদের আহার করাতেন এবং আমাকেও তিনি দারুণভাবে আপ্যায়ন করেন।’

ডক্টর হুসাইন মুনিস উল্লেখ করেছেন যে, বনু রিয়াহ গ্রামটি ছিল আন্দালুসের বুকে বনু হিলাল গোত্রের আরবদের প্রথম বসতি, যারা আন্দালুসে হিজরত করেছিলেন। সম্ভবত গ্রামটি দক্ষিণ আন্দালুসের উপকূলের কাছাকাছি জিব্রাল্টার বা জাবালুল ফাতহের পাশেই অবস্থিত ছিল।

সেখান থেকে ইবনে বতুতা সরাসরি জিব্রাল্টারে যান এবং মরক্কোর আসিলা শহরের অধিবাসীদের একটি জাহাজে চড়ে বসেন। তিনি লিখেছেন: ‘আমি সেউতাতে পৌঁছালাম, সেখানকার তৎকালীন গভর্নর ছিলেন শেখ আবু মাহদি ঈসা বিন সুলাইমান বিন মনসুর এবং কাজী ছিলেন ফকিহ আবু মুহাম্মদ আল-জাজান্দারি। এরপর আমি সেখান থেকে আসিলা গেলাম এবং কয়েক মাস অবস্থান করলাম। আসিলা থেকে সালা এবং সালা থেকে মারাকেশ শহরে পৌঁছালাম। এটি অত্যন্ত সুন্দর ও বিশাল এক শহর, যেখানে রয়েছে প্রচুর নিয়ামত এবং বড় বড় মসজিদ—যেমন আল-কুতুবিয়া মসজিদ নামে পরিচিত বিখ্যাত জামে মসজিদ এবং এর বিশাল ও চমৎকার মিনার। আমি সেই মিনারে আরোহণ করেছিলাম এবং সেখান থেকে পুরো শহরটি আমার চোখে পড়েছিল।’

মারাকেশে ইবনে বতুতা মারিনি সুলতানের সাথে দেখা করেন, যিনি তাকে নিজের কাছে টেনে নেন, আশ্রয় দেন এবং তার রাজদরবারের অন্তর্ভুক্ত করে ভ্রমণ অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করেন। তিনি লিখেছেন: ‘অতঃপর আমি আমাদের মহান সুলতানের রাজকীয় কাফেলার সাথে মারাকেশ ত্যাগ করলাম। আমরা প্রথমে সালা এবং পরে চমৎকার, সবুজ ও সুসজ্জিত মেকনেস শহরে পৌঁছালাম, যার চারপাশ জলপাইয়ের বাগানে ঘেরা ছিল। অবশেষে আমরা রাজধানী ফাসে পৌঁছালাম—আল্লাহ এই শহরকে রক্ষা করুন—এবং সেখানে আমি সুলতানের দরবারে বিদায় নিলাম।’

সূত্র : আল জাজিরা