চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে যাত্রীদের জীবন হুমকির মুখে, রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি
বাংলাদেশে সবচেয়ে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক গণপরিবহন হিসেবে রেলপথের সুনাম বহুদিনের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা সেই নিরাপত্তাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দেশের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ট্রেনে ছোড়া হচ্ছে ইট-পাথর। এতে আহত হচ্ছেন নারী, শিশু, বয়স্ক যাত্রী, এমনকি ট্রেনচালক, গার্ড ও টিকিট পরীক্ষকরাও। ভেঙে যাচ্ছে ট্রেনের জানালা-দরজার কাচ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোচের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। একদিকে যাত্রীদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, গত এক বছরে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় প্রায় ৫০ জন যাত্রী ও রেলকর্মী আহত হয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন ট্রেনে দেড় শতাধিক পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
রেলের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভাঙা জানালা, দরজার কাচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতে বছরে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে প্রায় আড়াই হাজার দরজা-জানালার কাচ ভেঙে গেছে পাথরের আঘাতে।
গত এক বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা:-
গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন রেলপথে একের পর এক পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
রাজশাহী-ঢাকা আন্তঃনগর রুটে কয়েকটি ট্রেনের জানালার কাচ ভেঙে একাধিক যাত্রী আহত হন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলন্ত ট্রেনে ছোড়া পাথরে নারী ও শিশুসহ কয়েকজন যাত্রী রক্তাক্ত হন।
গাজীপুর, টঙ্গী, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঈশ্বরদী, নাটোর ও রাজশাহী অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে।
কয়েকটি ঘটনায় ট্রেনের চালকের কেবিনের কাচ ভেঙে যাওয়ায় অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী কয়েকজন কিশোর ও মাদকাসক্তকে আটক করলেও অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীরা শনাক্ত হয়নি।
২০ জেলা ও ৬৫টি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট:-
বাংলাদেশ রেলওয়ের হিসাবে, দেশের ২০টি জেলায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে পাঁচটি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৫টি জেলা রয়েছে।
এ ছাড়া সারা দেশে ৬৫টি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করেছে রেলওয়ে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৩৬টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ২৯টি স্পট রয়েছে। এসব এলাকায় ট্রেন ধীরগতিতে চলা, ঘনবসতি ও রেললাইনসংলগ্ন বসতি থাকার কারণে পাথর নিক্ষেপের ঝুঁকি বেশি।
কেন ঘটছে এই অপরাধ:-
রেল কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিশোরদের দুষ্টুমি, মাদকাসক্তদের বেপরোয়া আচরণ, সামাজিক অবক্ষয় এবং সচেতনতার অভাব থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। কোথাও কোথাও স্থানীয় বিরোধ কিংবা ক্ষোভ থেকেও ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো দুষ্টুমি নয়; এটি প্রাণনাশের চেষ্টা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ।
রেলের মহাপরিচালকের বক্তব্য:-
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, "চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে যাত্রী, গার্ড ও রেলকর্মীরা নিয়মিত আহত হচ্ছেন।"
তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচার, লিফলেট বিতরণ, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং রেল নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। এসব উদ্যোগে ঘটনা কিছুটা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
পশ্চিমাঞ্চল জিএমের মতামত:-
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বলেন, "শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ এবং সচেতন নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।"
কঠোর আইন থাকলেও প্রয়োগে ঘাটতি:-
রেলের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীরা শনাক্ত বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আসায় এ প্রবণতা কমছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপদ রেলযাত্রার দাবি:-
যাত্রীদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি, সিসিটিভি স্থাপন, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। অন্যথায় নিরাপদ বাহন হিসেবে রেলের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।