রাজশাহীতে দখলদারদের কবজায় গৃহায়নের ১২৫ কোটি টাকার জমি

Land worth Tk 125 crore
আবুল কালাম আজাদ ১৫ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ ১৫ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন
রাজশাহীতে দখলদারদের কবজায় গৃহায়নের ১২৫ কোটি টাকার জমি
রাজশাহী নগরীর অভিজাত উপশহর আবাসিক এলাকায় বছরের পর বছর বরাদ্দহীন পড়ে আছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ২৩টি প্লট।

রাজশাহী নগরীর অভিজাত উপশহর আবাসিক এলাকায় বছরের পর বছর বরাদ্দহীন পড়ে আছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ২৩টি প্লট। এর মধ্যে অন্তত ২০টি প্লট দখল করে কোথাও দোকানপাট, কোথাও ক্লাব ও রাজনৈতিক কার্যালয়, আবার কোথাও বসতঘর নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি এই সম্পদের দেখভালে অব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দ না দেওয়ার সুযোগে দখলদারিত্ব বাড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।


স্থানীয়দের হিসাবে, এসব প্লটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। সরকারি নিয়মে প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সরকারি সম্পদ দখলে থাকায় একদিকে যেমন বিপুল সম্পদের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।


গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে রাজশাহী হাউজিং এস্টেট গড়ে ওঠে। পরে ১৯৮০ সালে উপশহর আবাসিক এলাকার প্লট বরাদ্দ শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে প্রায় দেড় হাজার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখনো ২৩টি প্লট বরাদ্দহীন রয়েছে।


সরেজমিনে দেখা গেছে, উপশহরের ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সংরক্ষিত ২৪০/১, ২৪০/২, ২৪০/৩ ও ২৪০/৪ নম্বর প্লট দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেগুলো দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। পর্যাপ্ত আবেদন না পাওয়ায় এসব প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক দশক ধরে প্লটগুলো দখলে রয়েছে।


স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর আল মামুন সরকার একসময় এসব প্লট দখলে রেখেছিলেন। সেখানে আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্ড কার্যালয়ও স্থাপন করা হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পর ওই কার্যালয় ভেঙে সেখানে যুবদলের কার্যালয় গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি কয়েকটি আধাপাকা ঘর নির্মাণ করে বসতিও গড়ে তোলা হয়েছে।


শুধু ২ নম্বর সেক্টর নয়, ১ নম্বর সেক্টরের কয়েকটি বরাদ্দহীন প্লটও দখল করে দোকানপাট, ক্লাবঘর ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ৩ নম্বর সেক্টরের কয়েকটি প্লটেও নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সূত্র বলছে, মোট ২৩টি বরাদ্দহীন প্লটের মধ্যে ১ ও ২ নম্বর সেক্টরেই রয়েছে অন্তত ২০টি।


১ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, “অভিজাত এলাকায় এতগুলো প্লট বছরের পর বছর পড়ে থাকায় অধিকাংশই দখল হয়ে গেছে। কোথাও মাদকসেবীদের আড্ডা, আবার কোথাও বস্তি গড়ে উঠেছে। এতে এলাকার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।”


৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আলী আকবর বলেন, প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হলে সরকার বিপুল রাজস্ব পেতে পারে। অথচ দীর্ঘদিনেও কেন এগুলো বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। এতে সরকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি দখলদারিত্বও বাড়ছে।


আরেক বাসিন্দা মাজদার হোসেন বলেন, কিছু প্লট দখল করে ক্লাব গড়ে তোলা হয়েছে। এসব স্থানে রাতে জুয়ার আসর বসে এবং কোথাও মাদকের কারবার চলে বলেও অভিযোগ রয়েছে। দ্রুত প্লটগুলো উদ্ধার করে নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।


গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানায়, আশির দশকে পরিচালিত এক জরিপে ২৬টি প্লট ফাঁকা পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে তিনটি প্লট মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাকি প্লটগুলো আর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে বর্তমানে ২৩টি প্লট বরাদ্দহীন রয়েছে।


স্থানীয় বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম বলেন, উপশহর এলাকায় বর্তমানে এক কাঠা জমির দাম প্রায় ৮০ লাখ টাকা। সে হিসাবে ২৩টি প্লটের বাজারমূল্য শত কোটি টাকার বেশি। এসব প্লটের আয়তন পৌনে দুই কাঠা থেকে সাড়ে সাত কাঠা পর্যন্ত।


এ বিষয়ে রাজশাহী গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী সোহেল সরকার বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত চারটি প্লটের বিপরীতে কোনো আবেদন না আসায় সেগুলো বরাদ্দ দেওয়া যায়নি। পরে ২০২৪ সালে কোটাব্যবস্থায় পরিবর্তন এলেও এ বিষয়ে নতুন কোনো সরকারি সার্কুলার বা নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমানে এসব প্লট বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই।


তিনি বলেন, অন্য বরাদ্দহীন প্লটগুলোও নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার কোনো সার্কুলার না থাকায় তা করা সম্ভব হচ্ছে না। এরই মধ্যে অনেক প্লট দখল হয়ে গেছে। তবে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে দখলে থাকা এসব প্লট উদ্ধার করা সম্ভব হবে।


সরকারি সম্পত্তি এভাবে বছরের পর বছর বরাদ্দহীন ও দখলে পড়ে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত এসব প্লটের বর্তমান অবস্থা যাচাই করে দখলমুক্ত করা এবং সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হলে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে সরকার পেতে পারে বিপুল রাজস্ব।