অডিট আপত্তির মধ্যেই রেল ডিজিকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি প্রচার ॥ রেলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নে মিডিয়া বিভ্রান্তির অভিযোগ
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেনকে ঘিরে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রচারণাকে কেন্দ্র করে রেল অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অডিট আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে রেলের কয়েকজন সাবেক ও অপসারিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও দুদকের মামলা সামনে এনে দাবি করা হচ্ছে—নিজেদের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া থেকে জনদৃষ্টি সরাতে একটি মহল বর্তমান ডিজিকে টার্গেট করে পাল্টা প্রচারণায় নেমেছে।
রেল সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের বিভিন্ন ব্যয়, বিল পরিশোধ, চুক্তি বাস্তবায়ন ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারি নিরীক্ষায় একাধিক আপত্তি ওঠার বিষয়টি সামনে আসে। এসব আপত্তির অঙ্ক নিয়েও বিভিন্ন মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রচার হচ্ছে। তবে রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, অডিট আপত্তি ওঠা মানেই দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাব, প্রয়োজনীয় নথি এবং অডিটের পরবর্তী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এসব আপত্তি নিষ্পত্তির প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে।
রেলওয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের অধিকাংশ অডিট আপত্তি ইতোমধ্যে নিষ্পত্তির পথে রয়েছে। কোনো কোনো আপত্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও ব্যাখ্যাও অডিট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রাথমিক অডিট পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
এদিকে বর্তমান ডিজি মো. আফজাল হোসেনকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগের পাশাপাশি তার পূর্ববর্তী দায়িত্বকাল, বিশেষ করে প্রকল্প পরিচালনার সময়কার কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এসব অভিযোগের কোনোটি তদন্তাধীন থাকলে তার চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের আগে কাউকে দায়ী করার বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এরই মধ্যে রেলের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী মো. রমজান আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলা থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২০২০ সালে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ পৃথক মামলা করা হয়। মামলাগুলোতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
অন্যদিকে রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরীকেও ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে দুদকের মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগে সরকারি অর্থের বড় ধরনের ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ মামলার অভিযোগও আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তা অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
রেল সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের অভিযোগ, এসব সাবেক ও অপসারিত কর্মকর্তাকে ঘিরে চলমান মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং একই সময়ে বর্তমান ডিজিকে লক্ষ্য করে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক অভিযোগ প্রকাশ—দুটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
তাদের দাবি, ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক বিরোধের জেরে একটি মহল গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে রেল প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে রমজান আলীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ডিজিকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার হওয়ার পরও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। রেল সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, প্রতিবেদনে অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। ফলে একপেশে তথ্যের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে গণমাধ্যমে কোনো অভিযোগ প্রকাশিত হলেই সেটিকে ষড়যন্ত্র বা অপপ্রচার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সরকারি প্রকল্পে বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি উঠলে তা নিয়ে অনুসন্ধান ও প্রশ্ন তোলা গণমাধ্যমের স্বাভাবিক দায়িত্ব। একইভাবে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য প্রকাশ করাও সাংবাদিকতার অংশ।
তবে অভিযোগ, তদন্তাধীন বিষয় এবং প্রমাণিত অপরাধ—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে উপস্থাপন করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মূল শর্ত।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের দাবি, রেলের চলমান উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন প্রচারণা চালাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, নিজেদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া থেকে দৃষ্টি সরাতেই তাকে লক্ষ্য করে এসব কর্মকাণ্ড করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সব অভিযোগের জবাব দেওয়া সম্ভব এবং কোনো ধরনের অপপ্রচারে রেলের সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম থামবে না।
অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পসহ যেসব প্রকল্পে অডিট আপত্তি উঠেছে, সেগুলোর প্রতিটির বর্তমান অবস্থা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে কি না। কোন আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে, কোনটি প্রত্যাহার হয়েছে এবং কোনটি এখনো অনিষ্পন্ন—নথিভিত্তিকভাবে এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিতর্কের বড় অংশের অবসান হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অডিট আপত্তির প্রতিটি বিষয় যথাযথভাবে নিষ্পত্তি হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি তদন্তাধীন কোনো অভিযোগকে আগেভাগে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে প্রচার করাও সমীচীন নয়। একইভাবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে এবং প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের অডিট আপত্তিগুলোর প্রকৃত বর্তমান অবস্থা কী, ডিজির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা কতটুকু এবং সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চলমান দুদকের মামলার সঙ্গে বর্তমান প্রচারণার আদৌ কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন নথিভিত্তিক তথ্য, স্বাধীন তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য।
রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগ দিয়ে অভিযোগ মোকাবিলা নয়—নথি, অডিটের সিদ্ধান্ত ও তদন্তের ফলাফলই হওয়া উচিত শেষ কথা। এতে একদিকে সরকারি অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার সুযোগও কমে আসবে। শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় যে সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটিই রেলওয়ের চলমান বিতর্কের নিরপেক্ষ সমাধানের ভিত্তি হতে পারে।