মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স

বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নে সারাদেশে বিশেষ অভিযান

Zero tolerance against drugs
অনলাইন ডেস্ক ২৯ আগস্ট ২০২৬ ০৩:৩৪ অপরাহ্ন জাতীয়
অনলাইন ডেস্ক ২৯ আগস্ট ২০২৬ ০৩:৩৪ অপরাহ্ন
বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নে সারাদেশে বিশেষ অভিযান
--সংগৃহীত ছবি

মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে সরকার ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতি এখন মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। পুলিশ, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সমন্বিতভাবে সারাদেশে এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার বিধান রয়েছে। বর্তমানে মাদক সংক্রান্ত সকল অপরাধের বিচার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসি পর্যন্ত হয়।


আইনের প্রথম তফসিলে মাদককে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। 'ক' শ্রেণি: সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মাদক। যেমন- হেরোইন, কোকেন, ইয়াবা (অ্যামফিটামিন), পেথিডিন, আফিম, কোকা গাছ, প্রিকারসর কেমিক্যালস। এই শ্রেণির জন্য শাস্তি সবচেয়ে বেশি। ‘খ’ শ্রেণি: গাঁজা, ভাং, চরস ইত্যাদি। ‘গ’ শ্রেণি: অ্যালকোহল, বিয়ার, দেশি মদ, রেকটিফাইড স্পিরিট ইত্যাদি।


সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড:

আইনের পঞ্চম অধ্যায়ের ধারা ৩৬(১) এর সারণিতে দণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। প্রথম তফসিলের ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত মাদক যেমন- হেরোইন, কোকেন, ইয়াবা (অ্যামফিটামিন) এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। ধারা ৩৬(১) এর ক্রমিক ৭ ও ৮ অনুযায়ী, ‘ক’ শ্রেণির ৪ নং ক্রমিকভুক্ত হেরোইন, কোকেন, মরফিন জাতীয় মাদকের পরিমাণ ২৫ গ্রাম বা মিলিলিটারের ঊর্ধ্বে হলে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, আমদানি-রফতানি, ক্রয়-বিক্রয়, সংরক্ষণ ও হস্তান্তর-যে কোনো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একইভাবে ক্রমিক ১০ অনুযায়ী, 'ক' শ্রেণির ৫ নং ক্রমিকভুক্ত ইয়াবা বা অ্যামফিটামিন জাতীয় মাদকের ক্ষেত্রে ৪০০ গ্রামের ঊর্ধ্বে হলে একই দণ্ড।


‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ শ্রেণির শাস্তি :

‘ক’ শ্রেণির ক্ষেত্রে ৫ গ্রাম পর্যন্ত হলে অন্যূন ১ বছর, অনূর্ধ্ব ৫ বছর, ৫-২৫ গ্রাম পর্যন্ত হলে অন্যূন ৫ বছর, অনূর্ধ্ব ১০ বছর কারাদণ্ড। ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত গাঁজা, ভাং, চরস এর ক্ষেত্রে ধারা ৩৬(১) এর ক্রমিক ১৯ ও ২০ অনুযায়ী, ১ কেজি পর্যন্ত হলে অন্যূন ১ বছর, অনূর্ধ্ব ৩ বছর, ১-৫ কেজি হলে অন্যূন ৩ বছর, অনূর্ধ্ব ৭ বছর এবং ৫ কেজির ঊর্ধ্বে হলে অন্যূন ৭ বছর, অনূর্ধ্ব ১০ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।

'গ' শ্রেণিভুক্ত অ্যালকোহল জাতীয় মাদকের ক্ষেত্রে ক্রমিক ৩২ অনুযায়ী, ৫০ কেজি/লিটার পর্যন্ত অনূর্ধ্ব ১ বছর, ৫০-৫০০ কেজি/লিটার পর্যন্ত অন্যূন ৬ মাস, অনূর্ধ্ব ২ বছর এবং ৫০০ কেজি/লিটারের ঊর্ধ্বে হলে অন্যূন ২ বছর, অনূর্ধ্ব ৫ বছর কারাদণ্ড।


মাদক সেবনে শাস্তি :

ধারা ৩৬(১) এর ক্রমিক ১৬ ও ২১ অনুযায়ী, 'ক' ও 'খ' শ্রেণির মাদক সেবনের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন শাস্তি অন্যূন ৩ মাস, অনূর্ধ্ব ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। তবে ধারা ৩৬(৪) অনুযায়ী আদালত সেবনকারীকে কারাদণ্ডের পরিবর্তে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করতে পারেন। চিকিৎসায় অনিচ্ছুক হলে অন্যূন ৬ মাস, অনূর্ধ্ব ৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ধারা ৩৬(৫) অনুযায়ী নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জনশান্তি বিনষ্ট বা যানবাহন চালালে অনূর্ধ্ব ১ বছর কারাদণ্ড, ধারা ৪৬ অনুযায়ী সকল অপরাধ আমলযোগ্য এবং ধারা ৪৭ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধে জামিন প্রায় অসম্ভব।


৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার:

আইনের ধারা ৪৬ অনুযায়ী সকল মাদক অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য। ধারা ৪৭ অনুযায়ী, আদালত সহজে জামিন দিতে পারবে না, যদি না সে নারী, শিশু বা শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়। ধারা ৪৮ ও ৫১ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত, ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করতে হবে।


মোবাইল কোর্ট- সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড:

৩৬(১) এর ক্রমিক ১৬: 'ক' শ্রেণির মাদক সেবন (ধারা ৯(১)(গ) লঙ্ঘন)- শাস্তি অন্যূন ৩ মাস, অনূর্ধ্ব ২ বছর। যেমন - ইয়াবা, হেরোইন সেবনরত অবস্থায় ধরা পড়লে। ধারা ৩৬(১) এর ক্রমিক ২১ ও ২৫: 'খ' শ্রেণি (গাঁজা) ও 'খ' শ্রেণির ৩ নং (অ্যালকোহল) সেবন-শাস্তি ৩ মাস থেকে ২ বছর।


ধারা ৩৯: তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতার অপব্যবহার -কোনো অফিসার যদি বিনা কারণে কাউকে হয়রানিমূলক তল্লাশি বা গ্রেফতার করে, তার বিচারও মোবাইল কোর্টে হবে। শাস্তি অনূর্ধ্ব ১ বছর।


ধারা ৪২(১): যে অপরাধের জন্য স্বতন্ত্র কোনো শাস্তির উল্লেখ নেই, সেই সব লঘু অপরাধ-শাস্তি অনূর্ধ্ব ১ বছর।


এসব ধারায় কোকেন, হেরোইন, ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ‘ক’ তফসিলের মাদকদ্রব্য সেবন বা ব্যবহারসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য ৩ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছরের সাজার বিধান রয়েছে।


এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট খালিদ হোসাইন বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সময়োপযোগী আইন। এই আইনে ধারা ৩৬ অনুযায়ী ২৫ গ্রাম হেরোইন বা ২০০ গ্রামের বেশি ইয়াবার জন্য মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি রাখা হয়েছে যা সরকারের ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে ধারা ৩৬(৪) ও ধারা ১৮-তে মাদকসেবীকে অপরাধী না ভেবে রোগী হিসেবে চিকিৎসার সুযোগও রাখা হয়েছে। এটি অত্যন্ত মানবিক।


তিনি বলেন, আইনটির ধারা ৫৭ অনুযায়ী মোবাইল কোর্টকে ২ বছর পর্যন্ত শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ায় মাঠ পর্যায়ে মাদক প্রতিরোধে দ্রুত বিচার সম্ভব হচ্ছে।


ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কোন ভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।