পূর্ব রেলের আরএনবিতে বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, চীফ কমান্ডেন্ট জহিরুলের অস্বীকার
বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি) বদলি ও পদায়নকে ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চীফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলাম।
তাঁর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বদলি-পদায়ন একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ওপর চাপানো সমীচীন নয়।
সম্প্রতি কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, আরএনবিতে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি কিংবা নির্ধারিত বদলি ঠেকাতে ৩০ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রাখা হয় পূর্বাঞ্চল আরএনবির চীফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামকে। তবে এসব সাম্প্রতিক অভিযোগের স্বাধীন ও সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই।
‘অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন’:-
জহিরুল ইসলামের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিবাদপত্রে বলা হয়েছে, বদলি-পদায়ন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করে আসছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবাদে আরও বলা হয়, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তার ওপর বর্তায় না। কারও বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেন বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা উচিত।
তার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “মো. জহিরুল ইসলাম কোনো ধরনের অনিয়ম, অর্থ লেনদেন বা বদলি-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি একজন সফল, দক্ষ ও দায়িত্বশীল রেল কর্মকর্তা। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানাচ্ছি।”
অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা, ভিত্তিহীন হলে অব্যাহতির দাবি:-
প্রতিবাদকারী পক্ষের ভাষ্য, জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা যেতে পারে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যদিকে অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তাঁর পেশাগত সুনাম ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার দায়িত্বও সংশ্লিষ্টদের।
এতে আরও বলা হয়, নির্ভরযোগ্য ও সরাসরি প্রমাণ ছাড়া কোনো কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন তথ্য বা বক্তব্য প্রচার না করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ।
পুরোনো নথিতে অবশ্য ভিন্ন প্রেক্ষাপট:-
তবে জহিরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক একেবারে নতুন নয়। ২০১৭ সালে আরএনবিতে ১৮৫ জন সিপাহি নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট জহিরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় তাঁকে নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে আসামি করা হয়েছিল। দুদকের অভিযোগ ছিল, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়া এবং অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।
দুদকের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই মামলার পাশাপাশি জহিরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদের বিষয়েও অনুসন্ধান করা হয়েছিল। তবে মামলা বা অনুসন্ধান থাকা মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়; আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
বদলি-পদায়ন নিয়ে তদন্তই হতে পারে সমাধান:-
২০২৬ সালে আরএনবিতে বদলি ও পদায়ন নিয়ে নতুন করে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সুপারিশে বদলি হয়েছে, সংশ্লিষ্ট আদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি কী ছিল, বদলির আগে-পরে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আর্থিক যোগাযোগের কোনো প্রমাণ আছে কি না—এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা সম্ভব।
রেলের নিরাপত্তা বাহিনীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়ন নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তিগত সুনামের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে বাহিনীর শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সাধারণ রেলযাত্রীর নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত। ফলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য যেমন যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও তদন্তে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।