ইঞ্জিন সংকটে রেলের পণ্য পরিবহন॥ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঈশ্বরদী-রাজশাহী—সর্বত্র শিডিউল বিপর্যয়, কমছে আয়
২০২১-২২: পণ্যবাহী ট্রেন ২,৭৭০টি।
২০২৫-২৬: পণ্যবাহী ট্রেন ১,৪৬৭টি।
পশ্চিমাঞ্চলে পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য
দৈনিক চাহিদা: ১৯টি ইঞ্জিন।
কনটেইনার পরিবহন আয় ২০২১-২২:
প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা।
কনটেইনার পরিবহন আয় ২০২৪-২৫:
প্রায় ৭৭ কোটি টাকা।)
লোকোমোটিভ সংকটে দেশের দুই রেলাঞ্চলেই ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহন। পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে কনটেইনার, জ্বালানি তেল, খাদ্য ও সার পরিবহন কমে গেছে।
একই সংকটের প্রভাব পড়েছে পশ্চিমাঞ্চলেও। ঈশ্বরদী, রাজশাহী, খুলনা, পার্বতীপুরসহ উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলমুখী পণ্য পরিবহনেও পর্যাপ্ত ইঞ্জিন পাওয়া যাচ্ছে না। এতে রেলের রাজস্ব কমার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বাড়ছে সময় ও পরিবহন ব্যয়।
রেলওয়ের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ২ হাজার ৭৭০টি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১ হাজার ৪৬৭টিতে। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। একই সময়ে পণ্য পরিবহন থেকে রেলের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে ইঞ্জিন সংকটের সরাসরি প্রভাব:-
পণ্য পরিবহনে সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র পূর্বাঞ্চলে। চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড (সিজিপিওয়াই) থেকে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) একসময় নিয়মিত একাধিক কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল করত। এখন কোনো দিন এক, কোনো দিন দুইটি ট্রেন চললেও অনেক সময় ট্রেন চলাচলও বন্ধ থাকে।
চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে কনটেইনার পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইঞ্জিন না থাকায় পণ্যবাহী ট্রেনের শিডিউল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই কারণে সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও রংপুরগামী তেলবাহী ট্রেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্য, গম ও সারবাহী ট্রেনের চলাচলও কমেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে চট্টগ্রাম-ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে কনটেইনার ট্রেনের ট্রিপ ৬২টিতে নেমে আসে, যা প্রায় দেড় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে রেলসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
পশ্চিমাঞ্চলেও একই চিত্র:-
পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বন্দর যেমন দেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, তেমনি পশ্চিমাঞ্চলের ঈশ্বরদী জংশন দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
রেলের ওয়ার্কিং টাইম টেবিলের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলে প্রতিদিন পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য ১৯টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া যাত্রীবাহী ট্রেনসহ অন্যান্য কাজে প্রতিদিন শতাধিক ইঞ্জিনের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় কার্যকর ইঞ্জিনের সংখ্যা কম থাকায় সব ধরনের ট্রেনের শিডিউল ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঈশ্বরদীকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খাদ্যশস্য, সার, পাথর, জ্বালানি ও বিভিন্ন শিল্পপণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজশাহী অঞ্চলের কৃষিপণ্য এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার কৃষি উপকরণ পরিবহনেও রেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় সেই সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না।
পুরোনো ইঞ্জিন, বাড়ছে বিকল হওয়ার ঝুঁকি:-
রেলের পণ্য পরিবহনের সংকট শুধু ইঞ্জিনের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে নয়; রেল বহরের একটি বড় অংশের ইঞ্জিন পুরোনো হওয়াও বড় কারণ। পুরোনো লোকোমোটিভ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হওয়ায় কার্যকর ইঞ্জিনের সংখ্যা আরও কমে যায়।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রেলের মোট লোকোমোটিভের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন সময়ে মেরামতের জন্য অচল থাকে। ফলে কাগজে-কলমে ইঞ্জিনের সংখ্যা যতই থাকুক, বাস্তবে প্রতিদিনের ট্রেন পরিচালনায় ব্যবহারযোগ্য ইঞ্জিনের সংখ্যা অনেক কম।
যাত্রীবাহী ট্রেনের চাপে পণ্যবাহী ট্রেন :-
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় আরেকটি সমস্যা হচ্ছে সীমিত ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী—দুই ধরনের ট্রেন পরিচালনা। কোনো যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হলে অনেক সময় পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য নির্ধারিত ইঞ্জিন সেখানে ব্যবহার করা হয়। এতে পণ্যবাহী ট্রেনের শিডিউল পিছিয়ে যায়।
ফলে একটি পণ্যবাহী ট্রেন নির্ধারিত সময়ে না চললে শুধু ওই ট্রেনের পণ্য পরিবহনই বিলম্বিত হয় না; পরবর্তী ট্রেনের শিডিউলেও তার প্রভাব পড়ে। এভাবে একের পর এক ট্রেন বিলম্বিত হয়ে সামগ্রিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হয়।
কমছে রেলের আয়:-
পণ্য পরিবহন রেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব খাত। কিন্তু ট্রেন কমে যাওয়ায় এই খাতের আয়ও ধারাবাহিকভাবে কমছে।
কনটেইনার পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে কনটেইনার পরিবহন থেকে রেলের আয় ছিল প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৭৭ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে কনটেইনার পরিবহন থেকেই রেলের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পণ্যবাহী ট্রেনের সামগ্রিক সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এ খাতের রাজস্ব আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা যাচ্ছেন সড়কপথে:-
রেলপথে পণ্য পরিবহন সাধারণত সড়কপথের তুলনায় সাশ্রয়ী। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ট্রেন না পাওয়া গেলে ব্যবসায়ীদের জন্য কম খরচের সুবিধাটি আর কার্যকর থাকে না।
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে আমদানিকারকদের ডিটেনশন ও ডেমারেজের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়। কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছাতে দেরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
পশ্চিমাঞ্চলেও একই ধরনের সমস্যা :-
কৃষিপণ্য, সার, পাথর ও অন্যান্য পণ্য নির্ধারিত সময়ে পরিবহন করা না গেলে ব্যবসায়ীদের বিকল্প হিসেবে সড়কপথ বেছে নিতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
নতুন অবকাঠামো, কিন্তু পর্যাপ্ত ইঞ্জিন নেই:-
রেলওয়েতে গত এক দশকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন রেললাইন, স্টেশন ও অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকোমোটিভ ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা একই অনুপাতে বাড়েনি।
পশ্চিমাঞ্চলে নতুন ও পুনর্বাসিত রেলপথ, সীমান্ত বাণিজ্য এবং বিভিন্ন শিল্প ও বিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অথচ ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেই সম্ভাবনার পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম থেকে ঈশ্বরদী—সমস্যার ধরন একই:-
পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও ইঞ্জিন সংকটের সমস্যাটি প্রায় একই। চট্টগ্রামে এর প্রভাব পড়ছে বন্দর ও কনটেইনার পরিবহনে; আর পশ্চিমাঞ্চলে প্রভাব পড়ছে কৃষিপণ্য, সার, পাথর, জ্বালানি ও শিল্পপণ্য পরিবহনে।
রেলের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ না থাকায় পণ্য পরিবহনের বড় একটি বাজার সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে রেলের রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি জাতীয় পরিবহন ব্যবস্থায়ও বাড়ছে ব্যয়।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা:-
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু ইঞ্জিন মেরামত করে বহরে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু নতুন ইঞ্জিন কেনা নয়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত খুচরা যন্ত্রাংশ, দক্ষ জনবল এবং পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য নির্দিষ্ট ইঞ্জিন বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহন থেকে শুরু করে ঈশ্বরদী-রাজশাহী ও উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও শিল্পপণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবা নিশ্চিত করা গেলে রেলের রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি সড়কপথের ওপর চাপও কমানো সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলকে যদি দেশের প্রধান গণপরিবহনের পাশাপাশি কার্যকর পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত করতে হয়, তাহলে লোকোমোটিভ সংকটের স্থায়ী সমাধান এখন আর কেবল পরিচালনাগত বিষয় নয়; এটি রেলের আয়, বন্দর কার্যক্রম এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।