রাজশাহীতে বেওয়ারিশ কুকুরের দাপট, রাস্তায় বের হলেই আতঙ্ক পথচারী
রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন সড়ক, পাড়া-মহল্লা ও আবাসিক এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নগরবাসী। দিনের তুলনায় সন্ধ্যা ও রাতে দলবদ্ধ কুকুরের বিচরণ বেশি দেখা যায়। পথচারী, শিক্ষার্থী, শিশু ও মোটরসাইকেল আরোহীদের পিছু নেওয়া কিংবা তাড়া করার ঘটনায় বাড়ছে আতঙ্ক। অনেক এলাকায় কুকুরের দল রাস্তা দখল করে থাকায় স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে জটিল হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে একা চলাচলকারী মানুষ ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নেওয়া জরুরি হলেও চলতি বছর রাজশাহীতে এ টিকার সরবরাহ সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাড়া-মহল্লা, বাজার, আবাসিক এলাকা ও প্রধান সড়কের আশপাশে দলবদ্ধ কুকুরের আনাগোনা নিয়মিত দেখা যায়। খাবারের সন্ধানে এসব কুকুর আবর্জনার স্তূপ ও খাবারের দোকানের আশপাশে জড়ো হয়। তাড়াতে গেলে দলবদ্ধভাবে তেড়ে আসার ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
কুকুর নিয়ন্ত্রণ রাসিকের দায়িত্ব:-
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘কুকুর নিয়ন্ত্রণ’ তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় টিকাদানের ব্যবস্থাও করার ক্ষমতা করপোরেশনের রয়েছে।
ফলে নগরবাসীর প্রশ্ন, দায়িত্বের আওতায় থাকা সত্ত্বেও নগরীর বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও দৃশ্যমান কার্যক্রম কতটা হচ্ছে?
তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য থাকলেও বেওয়ারিশ কুকুরের টিকাদান বা জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচির তথ্য পাওয়া যায়নি।
জলাতঙ্কের টিকা নিয়ে উদ্বেগ:-
কুকুরের উৎপাতের পাশাপাশি জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ১০ জানুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহী বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এক মাসের বেশি সময় ধরে জলাতঙ্কের টিকার সংকট চলছিল এবং প্রাণীর কামড়ের শিকার রোগীরা টিকা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন।
এরপর ২৫ ও ২৬ এপ্রিল প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকার তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে টিকা সংগ্রহ করে রোগীদের দেওয়ার চেষ্টা করলেও একপর্যায়ে সেই সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়।
তবে বর্তমানে রামেক হাসপাতালের সরকারি ওয়েবসাইটে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের জন্য বিনামূল্যে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন সেবার কথা উল্লেখ রয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে সরবরাহ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন হয়ে থাকে।বর্তমান মজুতের অবস্থা সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
কুকুর তাড়িয়ে সমাধান নয়:-
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বেওয়ারিশ কুকুরের সমস্যা মোকাবিলায় শুধু ধরে সরিয়ে দেওয়া বা তাড়িয়ে দেওয়ার মতো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়।
কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ, জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা—সবগুলো কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
জাতীয় পর্যায়েও কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের পর কুকুরের টিকাদান ও সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত কর্মসূচি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিতেও জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে কুকুরকে ব্যাপক হারে টিকাদানকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই নগর পর্যায়ে কুকুর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদান কর্মসূচি চালু রাখা জরুরি।
নগরবাসীর দাবি:-
নগরবাসীর দাবি, কুকুর নিধন নয়; মানবিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে কুকুরের টিকাদান, জন্মনিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে।
বিশেষ করে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও আবাসিক এলাকার আশপাশে দলবদ্ধ কুকুরের উপস্থিতি কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নগরবাসীর প্রশ্ন,বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত আরও বাড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি আগেই সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে?
রাজশাহীর মতো একটি জনবহুল নগরে মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বিষয়টি এখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে কুকুরের কল্যাণ ও জনস্বাস্থ্য—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, মানবিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার তাগিদ রয়েছে।