রাজধানীর ফলের বাজারে আগুন ॥ কমলা ৫৫০, মাল্টা ৪৫০ টাকা কেজি

Orange 550, Malta 450 taka per kg
অনলাইন ডেস্ক ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:১০ অপরাহ্ন জাতীয়
অনলাইন ডেস্ক ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:১০ অপরাহ্ন
রাজধানীর ফলের বাজারে আগুন  ॥  কমলা ৫৫০, মাল্টা ৪৫০ টাকা কেজি
--সংগৃহীত ছবি

রাজধানীর বাজারে ফল কিনতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন ক্রেতারা। এক কেজি কমলার দাম উঠেছে ৫৫০ টাকা। মাল্টাও বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। অথচ বছরের এ সময়ে দেশে কমলার মৌসুম শুরু হওয়ার কথা। শুধু খোলা বাজার নয়, সুপারশপে এসব ফলের দাম আরও বেশি।


রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার ফল ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।


খুচরা ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যে, বাজারে কমলা ৫৫০ টাকা, মাল্টা ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা, আপেল ৩৮০ টাকা, আঙুর ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা, নাশপাতি ৩০০ টাকা, ডালিম ৪০০ টাকা এবং দেশি ড্রাগন ফল ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কলা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, পেঁপে ও তরমুজ ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।


অন্যদিকে সুপারশপে সবুজ আপেল ৫১০ টাকা, গালা আপেল ৪৫৫ টাকা, মাল্টা ৫১৫ টাকা, কমলা ৬৬৮ টাকা এবং নাশপাতি ৩৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।


অনলাইনের তথ্য বলছে, দেশে উৎপাদিত কমলার মৌসুম মূলত শরৎ থেকে শীতের শুরুতে। মৌলভীবাজারের জুড়ীতে স্থানীয় জাতের কমলার ভরা মৌসুম অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি। রাঙামাটির নানিয়ারচরেও নভেম্বরের শুরুতে কমলা পাকতে শুরু করে এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত গাছে থাকে। অর্থাৎ অক্টোবর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কমলা বাজারে আসতে শুরু করার কথা। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন দেশের মোট চাহিদা পূরণ করতে না পারায় বাজারে আমদানিকৃত কমলার ওপরই বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। আর আমদানিনির্ভর ফলের বাজারেই এখন দেখা দিয়েছে সরবরাহ সংকট।


মাল্টার বর্তমান দাম নিয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সেখানে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মাল্টার মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরবরাহ ঘাটতি। তাদের হিসাবে, স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টা প্রয়োজন। অথচ কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে এসেছে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার। সরবরাহের এই ঘাটতির পাশাপাশি উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানান আমদানিকারকরা। পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণেও বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।


মাল্টার আমদানি মূল্য ও খুচরা দামের ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিশর থেকে আমদানি করা মাল্টার প্রতি কেজির গড় আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা হলেও রাজধানীর খুচরা বাজারে তা ৫২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনার পরও কীভাবে মাল্টার খুচরা দাম ৫২০ টাকায় পৌঁছায়, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।


গত ৩ অক্টোবর সচিবালয়ে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হবে না। আমদানি করা মাল্টার অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নিতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


বিদেশি ফলের দাম বাড়ার পেছনে সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ের কর-শুল্কও বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ফল আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট, অগ্রিম আয়কর ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ মোট করভার অনেক ক্ষেত্রে ৯৬ দশমিক ১০ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়। বাংলাদেশ কাস্টমসের তথ্যেও সাইট্রাসজাতীয় ফলের একটি শ্রেণিতে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ দেখানো হয়েছে। ফলে আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর, জাহাজ ভাড়া, বন্দর খরচ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও পচনজনিত ক্ষতিসহ বিভিন্ন ব্যয় যোগ হয়ে খুচরা বাজারে ফলের দাম কয়েক ধাপে বেড়ে যায়।


ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শুনে মাল্টার শুল্কসংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খুলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তিনি। সরকার ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষকে স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কোনো পক্ষ কারসাজির চেষ্টা করলে পুরো ব্যবস্থার ওপরই আস্থার সংকট তৈরি হয়। শুল্কায়ন ব্যবস্থা এমন হতে হবে যাতে ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিক অ্যাসেসমেন্টের শিকার না হন। একই সঙ্গে পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগও রাখা যাবে না।


সভায় এনবিআরের প্রতিনিধি জানান, বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের প্রকৃত ক্রয়মূল্য আলাদা হলেও শুল্কায়নের ক্ষেত্রে সেই পার্থক্য সব সময় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এ কারণে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারদর ও উৎসমূল্য বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।


কয়েক মাসেই কমলার দাম বেড়েছে ২০০ টাকা


চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কারওয়ান বাজারে বিভিন্ন জাতের কমলা ১৮০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং মাল্টা ২২০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে কমলার দাম এখন ৫৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির সর্বোচ্চ দামের তুলনায় কেজিতে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে কমলার দাম। মাল্টার সর্বোচ্চ দামও ২৮০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৪৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।


খিলগাঁও এলাকার খুচরা ফল ব্যবসায়ী জলিল মোল্লা গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা তো খুচরা ব্যবসায়ী। কেজিতে বড়জোর ১০-১৫ টাকা লাভ করি। ফলের বাজার আসলেই বেশি। গত কয়েক দিন যাবৎ কমলা তো আনিই না। কারণ এত দাম, সবাই শুধু দাম শুনেই চলে যায়। পাইকারি বাজারে দাম কমলে আবার আনব।


ক্রেতা আজমল ফুয়াদ বলেন, কমলার কেজি ৫৫০ টাকা, এটা ভাবা যায়? মাল্টাও ৪৫০ টাকা কেজি। বাসায় তো পিচ্চিরা এই দুইটা ফলই বেশি পছন্দ করে। নিজেরা না খেলেও তো ওদের জন্য নিতে ইচ্ছে করে। এভাবে দাম বাড়লে তো সাধারণ মানুষ কিনতে পারবে না।


তিনি আরও বলেন, প্রত্যেকটা জিনিসেরই তো সীমা থাকে। ফল বাদ দেন, বাজারে কোনো সবজিই ৭০-৮০ টাকার নিচে নেই। মানুষ বাঁচবে কী খেয়ে? সরকারকে দ্রুত এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।