শোষণের আড়ালে কান্নার সুর: কবে ঘুচবে বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস?
ঝকমকে অট্টালিকা, উন্নত চওড়া রাস্তা আর প্রযুক্তির জোয়ারে গা ভাসানো এই আধুনিক সভ্যতার আড়ালেই বাস করে এক বিশাল অন্ধকার। যে অন্ধকারের বাসিন্দা এ দেশের লাখ লাখ বঞ্চিত মানুষ। প্রতিনিয়ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা এই সমাজের চাকা সচল রাখছেন, দিনশেষে তারাই থেকে যাচ্ছেন মূলধারার সবচেয়ে পেছনে, সব ধরনের আলো থেকে দূরে।
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো সংবিধানে সবার জন্য সমান বলা হলেও, বাস্তবতার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফুটপাতে কিংবা বস্তির স্যাঁতসেঁতে কোণে বেড়ে ওঠা শিশুটির কাছে বই-খাতার চেয়ে দুমুঠো ভাতের লড়াই অনেক বেশি বড়। তীব্র শীতে ফুটপাতে প্লাস্টিক মুড়ি দিয়ে ঘুমানো বৃদ্ধ কিংবা সামান্য চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরা খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কাছে 'অধিকার' শব্দটা এক চরম বিলাসিতা।
সমাজ ও অর্থনীতির চাকা যত এগোচ্ছে, ধনী ও দরিদ্রের মাঝখানের বৈষম্যের দেয়ালটি যেন ততই দীর্ঘ ও মজবুত হচ্ছে। বিত্তশালীদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের সমান্তরালে চলে এই বঞ্চিত শ্রেণির বেঁচে থাকার নির্মম সংগ্রাম। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও অনেক শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরি পান না। তাদের এই নীরব কান্না আর দীর্ঘশ্বাস শোনার মতো ফুরসত যেন সমাজের নীতিনির্ধারকদের নেই।
বিভিন্ন সময় সরকারি ও বেসরকারি স্তরে বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, তার বড় অংশই রয়ে যায় কাগজের পাতায়। ত্রাণ বা সাময়িক সাহায্য দিয়ে কখনোই একটি জনগোষ্ঠীর স্থায়ী মুক্তি সম্ভব নয়। প্রয়োজন তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
একটি রাষ্ট্র বা সমাজ কতটা উন্নত, তা কেবল জিডিপি বা উঁচু দালান দেখে পরিমাপ করা যায় না। বরং সেই সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষটি কেমন আছেন, সেটাই উন্নয়নের আসল মাপকাঠি। সমাজের এই বিশাল অংশকে অন্ধকূপে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। তাই আর কোনো ফাঁকা আশ্বাস নয়, অবিলম্বে এই সুবিধাবঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্র এবং সচেতন নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।