বৈষম্য বিলোপ আইন বাস্তবায়নে সামাজিক ঐকমত্যের তাগিদ
বৈষম্য শুধু ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতি অন্যায় নয়, এটি সমাজের কাঠামোর ভেতরে থাকা অসম সুযোগ, অধিকার তাই বৈষম্য বিলোপে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ—এমন মত উঠে এসেছে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বৈষম্য বিলোপ আইন বিষয়ক বিভাগীয় পর্যায়ের সংলাপে।
বুধবার (৭ অক্টোবর ২০২৬) রাজশাহীর সাহেববাজারের হোটেল ওয়ারিশানে লিড ইয়্যুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহিশন, ম্যানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (MJF)- অনগ্রসর সমাজ উন্নয়ন সংস্থা যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে আইনজীবী, সাংবাদিক, সরকারি প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, আদিবাসী প্রতিনিধি এবং যুব ও ছাত্রনেতারা অংশ নেন।
সংলাপে বক্তারা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের মূল ভিত্তি হলো মানুষের সমান মর্যাদা, অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে পরিচয়, লিঙ্গ, জাতিগত অবস্থান, আর্থসামাজিক বৈষম্য, প্রতিবন্ধিতা ও অন্যান্য কারণে অনেক মানুষ এখনো নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এসব বৈষম্য দূর করতে একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, বৈষম্য বিলোপ আইনকে কেবল একটি আইন হিসেবে দেখলে এর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। আইনটির সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অধিকার, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সেবায় সমান সুযোগের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। ফলে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক ও বৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বলেন, ভূমি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সেবায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে সমতলের আদিবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কাগজে-কলমে সমতা থাকলেই প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না; ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত বৈষম্য বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর সুরক্ষা ও প্রতিকারব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আইনজীবীরা আইনটির সম্ভাব্য প্রয়োগ, বৈষম্যের শিকার ব্যক্তির প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ এবং আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। সাংবাদিকরা বৈষম্যের ঘটনা ও প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা জনসম্মুখে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের দায়িত্বের কথা বলেন। সরকারি প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আইন বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে যুব ও ছাত্রনেতারা বলেন, বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে তরুণ প্রজন্মকে শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সমতা, মানবাধিকার ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, বৈষম্য বিলোপের লড়াই মূলত একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের লড়াই। আইন তখনই কার্যকর হবে, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, যুবসমাজ এবং সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।
সংলাপের মাধ্যমে বৈষম্য বিলোপ আইন সম্পর্কে অংশীজনদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। আয়োজকেরা জানান, বিভাগীয় পর্যায়ের এ ধরনের আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মতামত ও সুপারিশ আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।