সমন্বয়হীনতায় রেলের জমিতে দখল বাণিজ্যে ॥ নন্দনগাছী রেল স্টেশনে লিজের আড়ালে ৩০ একর জমি লুটপাট
একদিকে রেলের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ লিজ দেয়, অন্যদিকে স্থাপনা নির্মাণ ও তা দেখভালের দায়িত্ব থাকে প্রকৌশলী বিভাগের ওপর, আর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রধান বাণিজ্যিক দপ্তর। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই তিন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের চরম সমন্বয়হীনতা, নজরদারির অভাব এবং অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাতের সুযোগ নিয়ে রাজশাহীর চারঘাটের নন্দনগাছী রেলস্টেশনে চলছে রেলের জমি লুটের মহোৎসব। 'মাছ চাষ' কিংবা 'ধান চাষের' নামে লিজ নিয়ে জমি ভরাট করে দোকান ও মার্কেট বানিয়ে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালাচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা।
দীর্ঘ সাড়ে আট বছর বন্ধ থাকার পর গত আগস্টে নন্দনগাছী রেলস্টেশনটি চালু হলেও বদলায়নি দখলের চিত্র। স্টেশনসংলগ্ন প্রায় ৩০ একর ভূখণ্ড বর্তমানে অবৈধ দখলদারদের কব্জায়। সরেজমিনে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নন্দনগাছী স্টেশনের পাশে বর্তমানে ৩৮৬টি দোকান ও বাণিজ্যিক স্থাপনা রয়েছে, যার মধ্যে রেলের বৈধ অনুমোদন রয়েছে মাত্র ৩৭টির। বাকি ৩৪৯টি স্থাপনাই সম্পূর্ণ অবৈধ।
প্রতিটি দোকান থেকে প্রতি মাসে দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধ ভাড়া তুলছে প্রভাবশালী চক্রটি।আর এই অর্থের একটা অংশ যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট রেল কর্তাদের পকেটে।
মাছ চাষের লিজে মার্কেট নির্মাণ ও প্লট বিক্রি:-
স্থানীয় আওয়ামী লীগ সমর্থক রফিকুল ইসলাম নামের এক প্রভাবশালী মাছ চাষের কথা বলে রেলের ৪৫ শতকের একটি জলাশয় লিজ নেন। অভিযোগ রয়েছে, অসাধু রেল কর্মকর্তাদের চোখ বুজে থাকার সুযোগে রাতের আঁধারে জলাশয়টির বড় অংশ ভরাট করেন তিনি।
বাণিজ্যিক কোনো অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও সেখানে ১০টি দোকান বানিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন এবং জলাশয়ের জমি প্লট আকারে বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা।
ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী জানান, জলাশয়ের জমিতে দোকানের পজিশনের জন্য তিনি রফিকুলকে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। তার মতো আরও অনেকেই লাখ লাখ টাকা দিয়েছেন পজিশন কিনতে।
এদিকে, স্টেশনের উত্তর পাশে সানাউল্লাহ, মিজানুর রহমান ও মুকুল ইসলাম নামের অপর তিন প্রভাবশালী রেলের জমি দখল করে পাকা দোকানঘর ও মার্কেট তুলছেন।
সানাউল্লাহ নিজেই স্বীকার করেন—তিনি ‘ধানি জমি’ হিসেবে লিজ নিয়েছিলেন, কিন্তু আবাদ না হওয়ায় সেখানে দোকান বানিয়ে ভাড়া দিচ্ছেন! অন্যদিকে মিজানুর রহমান জানান, অনুমতি ছাড়াই নির্মাণকাজ চালাচ্ছেন, কাজ শেষ হলে নাকি অনুমতির আবেদন করবেন!
কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী:-
নন্দনগাছী বাজার ও স্টেশন এলাকার পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রধান মাধ্যম ছিল এই প্রাকৃতিক জলাশয়টি। ভরাট করার কারণে পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে বর্ষা মৌসুমে স্টেশন ও বাজার এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বর্ষা পার হয়ে গেলেও পানি নামছে না।
নিমতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "প্রতিবছর বর্ষায় স্টেশন এলাকা জলে ভেসে যায়। গত বছর পরিষদের পক্ষ থেকে লাখ লাখ টাকা খরচ করে জলাশয়টি সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু মাছ চাষের নামে লিজ নিয়ে রাতের আঁধারে তা ভরাট করে মার্কেট করা হচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হয়নি।"
বিভাগীয় সমন্বয়হীনতা ও অসাধু চক্রের ভূমিকা:-
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রেলের জমি লিজ দেওয়া থেকে শুরু করে তদারকি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তিন বিভাগের যে প্রশাসনিক সমন্বয় থাকার কথা ছিল, তা খাতায়-কলমেই সীমাবদ্ধ। ভূ-সম্পত্তি বিভাগ লিজ দেওয়ার পর প্রকৌশল বিভাগ কখনোই সরেজমিনে গিয়ে দেখে না লিজের শর্ত মেনে কাজ হচ্ছে নাকি অবৈধ স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। আর বাণিজ্যিক বিভাগও অনুমোদনহীন ব্যবসা পরিচালনা বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এই ঢিলেঢালা ভাব ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের 'ম্যানেজ' করেই প্রভাবশালীরা একের পর এক অবৈধ স্থাপনা দাঁড় করাচ্ছে। স্টেশন মাস্টার বাধা দিতে গেলেও তোয়াক্কা করছে না কেউ।
রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:-
সরদহ রোড রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ইকবাল কবির বলেন, "প্রভাবশালীরা কোনো কথাই শোনে না। জমিতে অবৈধ স্থাপনা তোলার সময় বাধা দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।"
পশ্চিম রেলের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. নাদিম সারওয়ার জানান, "নন্দনগাছী এলাকায় রেলের জমি দখলের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। সিএস ও আরএস নকশা অনুযায়ী জরিপ করে অবৈধ দখল প্রমাণিত হলে দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। জলাশয় ভরাট করে মার্কেট নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। সত্যতা পেলে তাৎক্ষণিকভাবে লিজ বাতিলসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
রেলের বিশাল ভূখণ্ড রক্ষায় দ্রুত এই সমন্বয়হীনতা দূর করে অসাধু চক্র ও প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা।