সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির রাজশাহী গোদাগাড়ীতে
রাজশাহী জেলার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির ওরাও সম্প্রদায়ের সব চেয়ে বড় গ্রাম গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের কাকনহাট পৌরসভার তালাই ছাতিনি । এই গ্রামে সাড়ংবরে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। তবে এই অঞ্চলের পূজা উদযাপনের পেছনে রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ইতিহাস সুরক্ষার এক চমৎকার গল্প।
নিকটবর্তি কুন্দলিয়া এলাকায় একসময় প্রচুর সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল এবং তারাই সাড়ম্বরে এই দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। পরবর্তীতে তৎকালীন হিন্দু পরিবারগুলো ভারতে চলে গেলে পূজাটি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
তবে সেই ঐতিহ্য ও উৎসবের আনন্দ হারিয়ে যেতে দেননি স্থানীয় ওরাওঁ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। পূজাটি ওরাওঁদের নিজস্ব ধর্মীয় সংস্কৃতি বা মূল উৎসব না হওয়া সত্ত্বেও, ১৯৭৩ সাল থেকে তালাই ছাতিনি পাড়ার আদিবাসীরা এই পূজার আয়োজন ও সার্বিক দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন।
তালাই ছাতিনি পাড়া পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য মজিন কেরকেটা জানান, ১৯৭৩ সাল থেকে তারা ধারাবাহিকভাবে এই দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছেন। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই আয়োজনে স্থানীয় বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
একসময় এই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নাচ-গানের সান্ধ্যকালীন আয়োজন হতো, যা মাঝখানে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। এ বিষয়ে পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি নিরেন চন্দ্র খালকো জানান, স্থগিত থাকা সেই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা তারা আবার ফিরিয়ে আনতে চান। আগামীতে জমকালো আয়োজনে ওরাওঁদের নিজস্ব নাচ-গানের পাশাপাশি প্রতিবেশী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী 'দাঁশাই নাচ' পরিবেশনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
তালাই ছাতিনি পাড়ার অধিবাসীরা জানান, নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের পাশাপাশি সার্বজনীন এই দুর্গোৎসবে অংশ নিতে পেরে তারা অত্যন্ত আনন্দিত। তাদের এই উদ্যোগের ফলে বহু বছরের পুরনো একটি ঐতিহ্য কেবল টিকেই থাকেনি, বরং এটি এখন স্থানীয় আদিবাসী-অনাদিবাসী সব সম্প্রদায়ের মানুষের এক মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে।