কোমরব্যথা এড়াতে কেমন বিছানায় ঘুমাবেন
সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে ঘুমের বিকল্প নেই। কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর যদি কোমরে ব্যথা অনুভব করেন, তাহলে আপনার শোবার বিছানাটির দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত নরম বা শক্ত বিছানা, ভুলভাবে শোয়া এবং দীর্ঘদিনের পুরোনো তোশক কোমরের অস্বস্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কোমরব্যথা দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত একটি সমস্যা।
দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, ভুল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা, ঝুঁকে কাজ করা কিংবা শরীরের স্বাভাবিক অবস্থান ঠিক না রাখার কারণে এ ধরনের ব্যথা দেখা দিতে পারে। তবে সব কোমরব্যথার কারণ এক নয়।
পেশি ও লিগামেন্টের সমস্যা থেকে শুরু করে মেরুদণ্ডের বিভিন্ন রোগও এর পেছনে থাকতে পারে।
ব্যথা কমাতে ও আরামদায়ক ঘুম নিশ্চিত করতে তাই শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে ঘুমের পরিবেশ এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
খুব নরম নয়, আবার অতিরিক্ত শক্তও নয়
কোমরব্যথায় কেমন বিছানায় ঘুমানো উচিত, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ মনে করেন, শক্ত বিছানাই সবচেয়ে ভালো। আবার কেউ নরম তোশকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বাস্তবে অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে মাঝারি শক্ত বা মিডিয়াম-ফার্ম ম্যাট্রেস আরাম ও কোমরের সমর্থনের মধ্যে ভালো ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
অতিরিক্ত নরম বিছানায় শরীরের ভারী অংশ বেশি দেবে যেতে পারে। এতে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত শক্ত বিছানায় কাঁধ ও নিতম্বের মতো অংশে চাপ পড়ে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই বিছানা বেছে নেওয়ার সময় এমন ম্যাট্রেস নির্বাচন করা ভালো, যা শরীরকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয় এবং একইসঙ্গে স্বাভাবিকভাবে শোয়ার সুযোগ তৈরি করে। তবে সবার শরীরের গঠন ও ব্যথার ধরন এক নয়। ফলে একজনের জন্য আরামদায়ক বিছানা অন্যজনের ক্ষেত্রে একই ফল নাও দিতে পারে।
মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ
মেরুদণ্ডের কোমরের অংশে স্বাভাবিকভাবেই সামনের দিকে একটি বাঁক থাকে। শোয়ার সময় এই স্বাভাবিক অবস্থান বজায় রাখতে পারলে কোমরের পেশি ও আশপাশের অংশে অপ্রয়োজনীয় চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
বিছানা যদি শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে শোয়ার ভঙ্গি অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব ঘুমের মানেও পড়তে পারে। তবে শুধু বিছানার কারণে মেরুদণ্ডের বক্রতা স্থায়ীভাবে বদলে যায়, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা মেরুদণ্ডের গঠনগত সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বিছানার উচ্চতা কেমন হবে
বিছানার উচ্চতা এমন হওয়া ভালো, যাতে সহজে ওঠা-বসা করা যায়। বিছানার কিনারায় বসলে পা মেঝেতে রাখতে এবং অতিরিক্ত কষ্ট ছাড়াই দাঁড়াতে পারা উচিত।
খুব নিচু বিছানা থেকে উঠতে গেলে কোমরে বেশি চাপ পড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত উঁচু বিছানায় ওঠানামাও কারও কারও জন্য কষ্টকর হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি বা যাদের আগে থেকেই কোমরব্যথা রয়েছে, তাঁদের জন্য বিছানার উচ্চতা আরাম ও নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।
পুরোনো তোশক বদলানোর সময় বুঝবেন যেভাবে
দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ম্যাট্রেসের কোনো অংশ দেবে যেতে পারে। মাঝখানে গর্তের মতো তৈরি হলে কিংবা শোয়ার সময় শরীর একদিকে হেলে পড়লে বিছানাটি বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। বিছানা সমতল ও শরীরকে যথাযথ সমর্থন দিচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখুন। তবে শুধু পুরোনো হলেই বিছানা বদলাতে হবে, এমন নয়। এর অবস্থা, ব্যবহারের আরাম এবং শরীরের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা জরুরি।
শোয়া থেকে ওঠার সঠিক কৌশল
কোমরব্যথা থাকলে বিছানা থেকে হঠাৎ উঠে বসা বা কোমর মোচড় দিয়ে ওঠা অস্বস্তি বাড়াতে পারে। তাই ধীরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে ওঠার চেষ্টা করুন।প্রথমে শরীরকে এক পাশে কাত করুন।
এরপর পা দুটো বিছানার কিনারার বাইরে নামান।
একই সময়ে হাতের সাহায্যে ধীরে ধীরে শরীরের ওপরের অংশ তুলে বসুন।
কয়েক মুহূর্ত বসে থেকে ভারসাম্য ঠিক হলে দাঁড়ান।
এই পদ্ধতিতে ওঠানামা করলে কোমরের ওপর আকস্মিক চাপ কমতে পারে। তবে ব্যথা বেশি থাকলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নড়াচড়া করতে হবে।
ঘুমের ভঙ্গিতেও আনুন পরিবর্তন
কোমরব্যথার ক্ষেত্রে শুধু বিছানা নয়, ঘুমের ভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ। চিৎ হয়ে শুলে হাঁটুর নিচে একটি বালিশ রাখা অনেকের আরাম দিতে পারে। আবার কাত হয়ে ঘুমানোর সময় দুই হাঁটুর মাঝখানে বালিশ রাখলে কোমরের ওপর চাপ কম অনুভূত হতে পারে। উপুড় হয়ে ঘুমালে কারও কারও কোমর ও ঘাড়ে অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই যে ভঙ্গিতে ব্যথা কম হয় এবং ঘুম ভালো হয়, সেটি বেছে নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকা এড়িয়ে চলুন। কাজের ফাঁকে উঠে একটু হাঁটুন এবং নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তুলুন। শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম কোমরের পেশি শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
কোমরব্যথা কয়েক দিনেও না কমলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ব্যায়াম ও পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে।
কোমরব্যথার সঙ্গে পায়ের শক্তি কমে যাওয়া, দুই পায়ের মাঝখানের অংশ অবশ হয়ে আসা, প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। জ্বর, গুরুতর আঘাত বা অকারণে ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলেও অবহেলা করা উচিত নয়।
মনে রাখবেন, কোমরব্যথা কমানোর জন্য দামি বিছানা কেনাই একমাত্র সমাধান নয়। শরীরের উপযোগী ম্যাট্রেস, সঠিক শোয়ার ভঙ্গি, নিয়মিত নড়াচড়া এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসা, এই বিষয়গুলোর সমন্বয় কোমরের সুস্থতা বজায় রাখতে বেশি কার্যকর হতে পারে।