বরেন্দ্রের মাঠে কৃষকের সবুজ স্বপ্নে ইঁদুরের থাবা: দিশেহারা কৃষক
চলছে কার্তিক মাস। বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ মাঠগুলো এখন আমন ধানের সবুজ সমারোহে ভরে উঠেছে। সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কিন্তু ঠিক এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাজশাহীর বরেন্দ্রাঞ্চলে আমন ধানক্ষেতে ব্যাপক আক্রমণ চালিয়েছে ইঁদুরের দল। ঝাঁকে ঝাঁকে ইঁদুর ক্ষেতের কাঁচা ও আধাপাকা ধান কেটে সাবাড় করে ফেলছে। শত চেষ্টা করেও ইঁদুরের এই তান্ডব রোধ করতে না পেরে চরম দুশ্চিন্তা ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এলাকার কৃষকরা।
জেলার তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠজুড়ে কৃষকের সোনালী ধানের ছড়াছড়ি থাকলেও সেখানে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ইঁদুর। ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, ক্ষেতে পোকার আক্রমণ দেখা দিলে কীটনাশক স্প্রে করে তা সহজেই দমন করা সম্ভব হয়!কিন্তু ইঁদুরের উপদ্রব কোনোভাবেই বাগে আনা যাচ্ছে না। বিষমাখা টোপ, আতপ চালের টোপ কিংবা জমিতে ফাঁদ পেতেও মিলছে না কোনো স্থায়ী প্রতিকার।
তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এলাকার পাঁচন্দর গ্রামের কৃষক বুলবুল জানান, তিনি চলতি আমন মৌসুমে ৮ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় অন্য বছরের তুলনায় এবার ফসল অনেক ভালো হয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে তার ক্ষেতের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতক জমির কাঁচা ধান কেটে সাবাড় করে ফেলেছে ইঁদুর।
গোদাগাড়ী উপজেলার চাঁনন্দালাই গ্রামের কৃষক তসিকুল ইসলামের চিত্রও একই। তিনি জানান, তার ৮ থেকে ১০ শতক জমির কাঁচা ধান ইঁদুরে কেটে নষ্ট করেছে। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে রাতে ক্ষেতের পাশে পুরোনো টায়ার পোড়ানো, পটকা ফোটানো কিংবা বিষটোপ ব্যবহার করেও এই ক্ষতিকর প্রাণী দমন করা যাচ্ছে না। নির্ধারিত সময়ে ধান ঘরে তুলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এখন থেকেই প্রহর গুনছেন তারা।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঁদুর শুধু একক কোনো কৃষকের ক্ষতি করছে না, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইরি) ২০১৩ সালের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. রফিকুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে শুধু ইঁদুরের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৫০ থেকে ৫৪ লাখ মানুষের এক বছরের সমপরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়। এছাড়া ২০১৪-১৫ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে শুধু ইঁদুরের কারণে ধান, চাল ও গম মিলিয়ে ৭২৩ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে।
বর্তমান চলতি মৌসুমে বরেন্দ্র অঞ্চলে বিগত বছরগুলোর তুলনায় ইঁদুরের আক্রমণ আরও বাড়ায় এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বড় হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে,পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ,বলে জানান ড. রফিকুল ইসলাম।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৩ হাজার ৩৮৭ হেক্টর জমি। এর মধ্যে পোকা দমনের জৈবিক পদ্ধতি হিসেবে পার্চিং, লাইন ও ধঞ্চা গাছ লাগানো হয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এছাড়া রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট সাড়ে ৩ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমিতে আমন চাষাবাদ হচ্ছে।
ইঁদুর দমনে কৃষকদের প্রচলিত বিষটোপের পাশাপাশি কিছু কার্যকরী প্রাকৃতিক ও যান্ত্রিক পদ্ধতি অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ বলেন, “ইঁদুর একটি জাতীয় সমস্যা, যা এককভাবে নয় বরং সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত লিফলেট বিতরণ ও কৃষক সমাবেশ করছেন। শুধু বিষটোপ নয়, কলাগাছ, লাঠি কিংবা বাঁশের কঞ্চিতে পলিথিন বেঁধে বাতাসে শব্দ তৈরির পদ্ধতি এবং রাতে ক্ষেতের পাশে টায়ার পোড়ানোর মাধ্যমে ইঁদুর কিছুটা তাড়ানো সম্ভব।”
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইঁদুর দমনে কেবল কীটনাশক বা টোপের ওপর নির্ভর না করে জমির আইল ছোট রাখা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা এবং সম্মিলিতভাবে ইঁদুরের গর্তে অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, কৃষকের গোলায় ধান ওঠার আগেই বরেন্দ্রের মাঠের স্বপ্ন ইঁদুরের গহ্বরে হারিয়ে যেতে পারে।