বাড়ির কাজের লোক-হুন্ডি ব্যবসায়ী থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান হন ময়না-জাহাঙ্গীর
একজন ছিলেন বাড়ির কাজের লোক। আরেকজন হুন্ডির কারবারি। রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সাবেক এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর আশীর্বাদে দুজন হয়েছিলেন দুই উপজেলার চেয়ারম্যান। অবৈধ পথে বিপুল অর্থবিত্তেরও মালিক হয়েছেন তারা। অবশেষে সাবেক এ দুই উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এ দুজন হলেন- রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম ও তানোর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান লুৎফর হয়দার রশীদ ময়না। দুজন দুই উপজেলা যুবলীগের সভাপতি। আওয়ামী সরকারের পতনের পর লাপাত্তা হওয়া সাবেক এমপি ফারুক চৌধুরীর সকল অপকর্মের সঙ্গী এ দুজন। তারাও এখন রয়েছেন আত্মগোপনে।
হুন্ডি কারবারি ছিলেন জাহাঙ্গীর
গোদাগাড়ীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি পৌরসভার সারেংপুর মহল্লায়। এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে জমজমাট ছিল গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ করিডর। এই করিডরে আসা গরুর রাখালি করতেন জাহাঙ্গীর আলম। তারপর নিজেই ভারত থেকে গরু আনা শুরু করেন। গরু আনতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন হুন্ডি কারবারে।
পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সময় তার এক আত্মীয় পৌরসভার মেয়র হলে তিনি ঠিকাদারী শুরু করেন। তখন এলাকার লোকজন তাকে যুবদল নেতা হিসেবেও চিনতেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভোল পাল্টে জাহাঙ্গীর আলম এলাকার এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। নিয়ন্ত্রণ নেন খাদ্যগুদামে ধান-চাল সরবরাহ সিন্ডিকেটের।
খুশি হয়ে ফারুক চৌধুরী তাকে তানোরের একটি কলেজের প্রভাষক হিসেবেও নিয়োগ দেন। এরপরই যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উপজেলা সভাপতির পদ পান। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি জাহাঙ্গীরকে। ফারুকের ইচ্ছায় হয়ে যান উপজেলা চেয়ারম্যানও।
স্থানীয় লোকজন জানান, টিআর-কাবিখা থেকে বিপুল টাকা হাতিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পারভেজ মোশাররফ বাবু ও যুবলীগ নেতা কাওসার মাসুমের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিন হাজার টাকা করে আদায় করতেন উপকারভোগীদের কাছ থেকে। এছাড়া কোনো নির্বাচন এলেই এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তুলতেন বিপুল অংকের টাকা। উপজেলা দলিল লেখক সমিতি থেকে কমিশন এবং ট্রলি ব্যবসায়ী সমিতি থেকেও বিপুল টাকা চাঁদা আদায় করেছেন এই যুবলীগ নেতা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবৈধ পথে উপার্জন করা বিপুল টাকা জাহাঙ্গীর বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। রাজশাহীর নিউমার্কেটে সাবেক এমপি ফারুকের থিম ওমর প্লাজায় ৫০ লাখ টাকায় কিনেছেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। কিনেছেন চারটি দোকানও। নিউমার্কেট এলাকায় একটি মুদি দোকানও কিনেছেন তিনি। গোদাগাড়ীতে ছিল গরুর খামার এবং রড-সিমেন্ট, ইলেকট্রনিক্স ও টাইলসের ব্যবসা। নওগাঁয় ছিল কাপড়ের ব্যবসা। করেছিলেন প্রাইভেট মাদ্রাসাও। গোদাগাড়ীতে জালিয়াতি করে খাসপুকুর দখলের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। উপজেলা সদরে জাহাঙ্গীর আলমের মার্কেট, আমতলী, হঠাৎপাড়া ও মাধবপুরসহ বিভিন্ন মৌজায় প্রায় ৫০ কোটি টাকার জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে সীমান্তের দিকে পালানোর চেষ্টা করেন জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় নৌকাটি উল্টে গেলে স্থানীয়রা জাহাঙ্গীর ও তার ছেলে জিসানকে ধরে ফেলেন। এ সময় জাহাঙ্গীর আলমকে গণধোলাই দেওয়া হয়। এতে তার পরনের জামা-প্যান্টও খুলে যায়। একপর্যায়ে পালিয়ে সীমান্ত লাগোয়া গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেন জাহাঙ্গীর। তারপর আর তার খোঁজ নেই। তিনি সীমান্ত অতিক্রম করেছেন বলে এলাকার লোকজন জানেন। কথা বলতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
ফারুকের কাজের লোক ছিলেন ময়না
তানোর উপজেলার চৌরখোর গ্রামে বাড়ি ময়নার। এ গ্রামেই বাড়ি ওমর ফারুক চৌধুরীর। ফারুকের প্রতিবেশী ভাতিজা ময়না বাবার আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কিশোর বয়সেই ফারুক চৌধুরীর কাজের লোক হিসেবে কাজ শুরু করেন। জমি-জায়গার দেখভাল থেকে শুরু করে ঠিকাদারি কাজের দায়িত্বও পালন করেন। ফারুক চৌধুরী আওয়ামী লীগে যোগ দিলে ময়নাও তার সঙ্গে ধীরে ধীরে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। ফারুক চৌধুরী ২০০৬ সালে তাকে কলমা ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতির পদে বসান। এরপর ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফারুক চৌধুরী এমপি নির্বাচিত হলে ময়নাও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।
ফারুক চৌধুরীর সমর্থন নিয়ে ময়না ২০১১ এবং ২০১৬ সালে পরপর দুইবার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হন। ২০১৫ সালে তিনি তানোর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হন। পরবর্তী সময়ে তানোরে ফারুক চৌধুরীর রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন এই ময়না। ২০১৯ সালে ইউপি চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন এবং জয়ী হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুণরায় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ময়না।
রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ময়না বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তিনি কলমা ইউনিয়নের চৌরখোর, বংশিধরপুর এবং পার্শ্ববর্তী নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার কুণ্ডহরি মৌজায় প্রায় ১০০ বিঘার আমবাগান গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে ৩০ বিঘা জমি তিনি কিনেছেন, বাকি ৭০ বিঘা সরকারি জলাশয়ের জমি দখল করেছেন। বর্তমান বাজারমূল্যে এই বাগানের মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী সরকারের আমলে ময়না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তানোর উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে ময়নার মাধ্যমে। উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নৈশপ্রহরী নিয়োগেও ৪-৫ লাখ টাকা করে আদায় করেছেন লুৎফর হায়দার রশীদ ময়না। এভাবে দীর্ঘ ১৬ বছরে ময়না অর্ধশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
স্থানীয়রা আরও জানান, তানোরে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৫৩০টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এমপি ফারুকের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ময়না গভীর নলকূপগুলোতে অপারেটর নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। হাতিয়েছেন বিপুল টাকা। তানোরে দেড় হাজারেরও বেশি সরকারি খাস পুকুর ইজারা নেওয়ার ক্ষেত্রেও ময়নার অনুমোদন ছাড়া কেউ ইজারা পেতেন না। মোটা অংকের টাকা ছাড়া কাউকে ইজারা দেওয়া হতো না। এ খাত থেকেও বিপুল টাকা হাতিয়েছেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ইউনিয়ন এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকায় ময়না টিআর এবং কাবিখা প্রকল্পের টাকাও আত্মসাৎ করেছেন। সরকারি খাদ্য গুদামে ধান ও চাল সরবরাহেও তার নিয়ন্ত্রণ ছিল। তাকে ম্যানেজ না করে কেউ খাদ্য গুদামে সরবরাহ করতে পারতেন না। এ খাত থেকেও কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তানোর ও পার্শ্ববর্তী নিয়ামতপুর উপজেলায় ময়নার ডিস ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। তার কারণে অন্য কেউ এ ব্যবসা করতে পারেননি। এভাবেই ডিস ব্যবসা করেও অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজশাহী শহরে তার একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। গত ৫ আগস্ট থেকে ময়না আত্মগোপনে। তার সঙ্গে কথা বলা যায়নি।
দুজনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
বুধবার জাহাঙ্গীর ও ময়নার বিরুদ্ধে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা হয়েছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জিন্নাতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা দুটি করেছেন। জাহাঙ্গীর আলমের নামে এক কোটি ১১ লাখ ৬৫ হাজার ১০১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে দুদক। আর ময়নার নামে তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার ৬১১ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জাহাঙ্গীর আলম ও ময়নার আয়বহির্ভুত এই সম্পদ খুঁজে পেয়েছে দুদক। মামলার তদন্ত চলাকালে আরও কোনও সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলে সেগুলো অভিযোগপত্রে সংযুক্ত করা হবে।