প্রশিক্ষণে ঘাটতি পূরণ হচ্ছে শিক্ষকদের
বাগেরহাটে বিষয়ভিত্তিক অষ্টম ও নবম শ্রেণি শিক্ষকদের নতুন কারিকুলাম বিস্তরণে প্রশিক্ষণ চলছে। বিভিন্ন উপজেলায় এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। শিক্ষকদের এই প্রশিক্ষণ চলবে সাত দিন। জেলার ৯টি উপজেলার ৫২৪টি মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচ হাজার ৩৩২ জন শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে আগামীতে স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাবেন।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া শিক্ষকরা বলছেন, প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে তাদের বিভিন্ন ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পাঠদান থেকে শুরু করে মূল্যায়ন পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে সহায়ক হবে এই প্রশিক্ষণ। সর্বোপরি এই প্রশিক্ষণ তাদের শিক্ষকদের আরো গতিশীল করবে।
নতুন কারিকুলাম বিস্তরণে যে ১১টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে, বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিল্প সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজ বিজ্ঞান, ইসলাম শিক্ষা, হিন্দু ধর্ম, বিজ্ঞান এবং জীবন জীবিকা।
নতুন কারিকুলাম বিস্তরণে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষকদের বাছাই করে তাদের প্রথমে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। মাস্টার প্রশিক্ষক হিসেবে ওই প্রশিক্ষকরা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে বাগেরহাট শহরের দশানী যদুনাথ স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা গেছে, তৃতীয় তলা বিশিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কক্ষে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ চলছে।
মাল্টিমিডিয়া এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রশিক্ষকরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া নারী-পুরুষ শিক্ষকরাও মনোযোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। নয় শতাধিক শিক্ষক ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া বাগেরহাট সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক অজিয়ার রহমান শিকদার জানান, নতুন কারিকুলাম শিক্ষার্থীদের জন্য চমৎকার। শ্রেণিকক্ষে শিখনকালীন মূল্যায়নের বিষয়ে শিক্ষকরা দক্ষতা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারলে শিক্ষার্থীরা অনেক উপকৃত হবে।
নতুন কারিকুলামের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সফল হবে। এই কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে পারলে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এগিয়ে যাবে বলে ওই শিক্ষক বিশ্বাস করেন।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া যদুনাথ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা রত্না রায় জানান, নতুন কারিকুলাম নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা চলছিল। কিন্তু এই প্রশিক্ষণ সব ধারণা পরিবর্তন করে দিয়েছে। তার এই প্রশিক্ষণ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ক্ষেত্রে অনেক সহায়ক হবে। শিক্ষার্থীদের কীভাবে পাঠদান করানো হবে, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভালোভাবে ধারণা পেয়েছেন। মুক্তধারা থেকে শুরু করে মূল্যায়ন পর্যন্ত নানা বিষয় সম্পর্কে তাদের শিখানো হচ্ছে। নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে তিনি পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেয়েছেন। এ বিষয়ে তাকে আর কোনো প্রশিক্ষণ নিতে হবে না বলে জানান ওই শিক্ষিকা।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিদ্যুৎ কুমার মন্ডল বলেন, আমার ভেতরে যেসব অভাব ছিল প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে এরই মধ্যে তা পূরণ হয়েছে। ওই কক্ষের প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীরা মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে প্রশিক্ষণে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করছেন।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফজর আলী জানান, অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকরা নানাভাবে তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন কারিকুলাম বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানোর নানা বিষয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া শিক্ষক মলয় ঘটক ও উদয় শংকর গাঙ্গুলিসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানোর ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণ যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। প্রযুক্তির ব্যবহার করে নানাভাবে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাঠদানের নানা কলাকৌশল সম্পর্কে তারা বাস্তব ধারণা পাচ্ছেন।
প্রশিক্ষক গাজী মো. মিজানুর রহমান জানান, তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তার কক্ষে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪০ জন শিক্ষক রয়েছে। মাল্টিমিডিয়াসহ নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে প্রশিক্ষণে। নতুন কারিকুলাম বিস্তরণে নানাভাবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লব্ধজ্ঞান শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানে সহায়ক হবে।
প্রশিক্ষক গোলাম রসুল ও শামীম হাসান জানান, তাদের কক্ষে ৫১ জনকে তারা বাংলা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। মাল্টিমিডিয়া, বিভিন্ন প্রযুক্তি, ইন্টারনেটযুক্ত অ্যানড্রয়েড ফোন, পোস্টারসহ নানা ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে প্রশিক্ষণে। শিক্ষকরা মনোযোগ সহকারে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া শিক্ষকরাও নানা বিষয় সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে পরিষ্কার ধারণা নিচ্ছেন। প্রশিক্ষকরাও নানা বিষয়ে শিক্ষকদের ধারণা দিচ্ছেন।
বাগেরহাট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ছায়েদুর রহমান জানান, জেলার মোড়েলগঞ্জ ও চিতলমারী উপজেলায় মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে বিষয় ভিত্তিক অষ্টম ও নবম শ্রেণি শিক্ষকদের নতুন কারিকুলাম বিস্তরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ। এর আগে সোমবার বাগেরহাট সদর, কচুয়া, মোংলা, রামপাল, ফকিরহাট, মোল্লাহাট এবং রবিবার শরণখোলা উপজেলায় শিক্ষকদের এই প্রশিক্ষণ শুরু হয়। প্রতিটি উপজেলার শিক্ষকদের সাতদিন ধরে প্রশিক্ষণ চলবে। জেলার মাধ্যমিক স্তরের ৫২৪টি বিদ্যালয়, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচ হাজার ৩৩২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। মোট ৩২৭ জন প্রশিক্ষক এই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
শিক্ষা কর্মকর্তা ছায়েদুর রহমান আরো জানান, দ্বিতীয় পর্যায়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক, চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক, অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, মাদরাসা সুপার, সহকারী মাদরাসা সুপার এবং অধ্যক্ষদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
বাগেরহাট সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম মোর্শেদ জানান, বাগেরহাট সদর উপজেলার মোট ৯২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯২২ জন শিক্ষক যদুনাথ স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ৬০ জন মাস্টার ট্রেনার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।