কোন পথে সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ?

Which way is fair elections and democratic transition
ড. বদিউল আলম মজুমদার ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৪:১৮ অপরাহ্ন মতামত
ড. বদিউল আলম মজুমদার ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৪:১৮ অপরাহ্ন
কোন পথে সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ?
ড. বদিউল আলম মজুমদার

একটি রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছিল জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাসহ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে । কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রান্ত হলেও সেই স্বপ্ন আজও পূরণ বাংলাদেশে গড়ে তুলতে পারিনি। বরং চরম বৈষম্যমূলক একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন আমাদের ওপর চেপে বসেছিল । সেই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনের অবসান ঘটে। গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে এই আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে যে, আর যেন কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরুত্থান না ঘটে, নির্বাচন ব্যবস্থা যেন পরিশুদ্ধ হয়, গণতন্ত্র যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং সর্বোপরি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে যাতে সুশাসন কায়েম হয় ।

সুষ্ঠু নির্বাচন

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।' কিন্তু মালিকরা সরাসরি দেশ পরিচালনা প্রক্রিয়ায় অংশ নেন না, তারা শাসন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় মূলত পরোক্ষভাবে, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে। আর জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের পদ্ধতিই হচ্ছে নির্বাচন। এই পদ্ধতি যদি সঠিক হয়, তবে মালিকরা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং একটি ‘রিপাবলিকান’ পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যে পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের স্বার্থে এবং কল্যাণে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। আর এই বাছাই প্রক্রিয়া বা নির্বাচন সঠিক না হলে জনগণের সম্মতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না । তাই একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি প্রতিনিধিত্বশীল কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই ।

সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ। কারণ আমরা 'সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা' ও International Covenant on Civil and Political Rights-এ স্বাক্ষরদাতা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে

আমাদেরকে এসব আন্তর্জাতিক আইন এবং চুক্তিও মেনে চলতে হবে ।

নির্বাচন একটি একদিনের বিষয় নয়। এটি একটি প্রক্রিয়া – দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া । এই প্রক্রিয়া সঠিক ও কার্যকর হতে হলে

ভোটার হওয়ার যোগ্য সকল ব্যক্তির ভোটার হতে পারেন;

প্রার্থী হতে আগ্রহী সকল ব্যক্তি প্রার্থী হতে পারেন;

ভোটারদের সামনে পর্যাপ্ত বিশ্বাসযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন বিকল্প প্রার্থী থাকে, যাতে ভোটাররা মার্কার পরিবর্তে প্রার্থীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন;

প্রার্থীরা যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারেন;

প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের সামনে যেন প্রয়োজনীয় তথ্য থাকে, যাতে তারা জেনে-শুনে-বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন;

নির্বাচন যেন পেশিশক্তি ও টাকার প্রভাবমুক্ত থাকে;

ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ও স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন;

ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত হয়;

নির্বাচন কমিশনসহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেন দল নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে;

রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীরা যেন সদাচারণ করেন;

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ যেন তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করেন;

নির্বাচনী বিরোধ যেন দ্রুততার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে সুরাহা হয়; এবং

পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য হয়।

নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সঠিক তথা স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আর এরজন্য প্রয়োজন দল নিরপেক্ষ, দক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিদেরকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদান। একইসাথে প্রয়োজন তাদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ সৃষ্টি।

বাংলাদেশে অতীতে, বিশেষত বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপরিউক্ত শর্তগুলো পূরণ হয়নি। ফলে ভোটাররা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা সুদূর পরাহত হয়েছে। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ও স্বাধীনতাপরবর্তী সকল গণআন্দোলন, বিশেষত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুততার সঙ্গে আমাদের একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান জরুরি। আরও জরুরি জুলাই অভ্যুত্থানের এবং এর পর্ববর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত গুম, খুনসহ সকল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিচার এবং কতগুলো মৌলিক রাষ্ট্র সংস্কারের আয়োজন। তাই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন, বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে।

গণতান্ত্রিক উত্তরণ

তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণ তথা একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন পূর্বশর্ত হলেও তা যথেষ্ঠ নয়। আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন তথাকথিত 'একদিনের গণতন্ত্র' – ভোট প্রদানের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটেনি। কারণ যদিও নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রাথমিক এবং অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, এটি এককভাবে গণতান্ত্রিক যাত্রাপথকে সুদৃঢ় করতে পারে না । বস্তুত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে টেকসই করতে হলে ‘ডেমোক্রেটিক ডেফিসিট' বা গণতন্ত্রের ঘাটতি দূর করা আবশ্যক, যা জন্য কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার জরুরি। সংস্কারের উদ্দেশ্য হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে বিরাজমান প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত ও দূরীকরণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একইসঙ্গে কাঠামোর পরিবর্তনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করা, যাতে আমাদের নির্বাচনব্যবস্থা কার্যকারিতা অর্জন করে এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের তথা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের পথ প্রশস্ত হয়। তবে এর জন্য আরও প্রয়োজন হবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ থেকে আমরা বাংলাদেশের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে মোটাদাগে সাতটি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছি। প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো: ১. নির্বাচনী অঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন; ২. রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন; ৩. নির্বাচনে টাকার অশুভ খেলা; ৪. নির্বাচন কমিশনের অকার্যকারিতা; ৫. নাগরিক সমাজের নিষ্ক্রিয়তা; ৬. নির্বাচনকালীন সরকারের পক্ষপাতদুষ্টতা; এবং ৭. ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্যহীনতা। শেষ দুটি প্রতিবন্ধকতা দূর হলে অবশ্য গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথও সুগম হবে। জটিল এবং ক্রমবর্ধমান এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানিকীকরণ । আর এর জন্য প্রয়োজন হবে কতগুলো গভীর আইনি, প্রতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার ।

আইনি সংস্কার: আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো দুর্বৃত্তায়িত নির্বাচনী অঙ্গন। রাজনীতিতে অলিগার্কদের আবির্ভাবের পর থেকেই নির্বাচনী অঙ্গন পরিপূর্ণভাবে দুর্বৃত্তদের দখলে চলে গিয়েছে। বস্তুত গত কয়েকটি তথাকথিত নির্বাচনে যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন তাদের অনেকেই নানা ধরনের অপরাধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, ব্যাংক লুট, অর্থপাচার থেকে শুরু করে তাদের অনেকই খুন- খারাবি ও দখলদারিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। আবার এদের কেউ কেউ সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীও ছিলেন এবং আইনের ফাঁক-ফোকর ব্যবহারকরে তারা সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং থেকেছেন । আইনি সংস্কারের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হওয়ার এবং থাকার যোগ্যতা এবং অযোগ্যতার মাপকাঠি কঠোর করার মাধ্যমেও নির্বাচনী অঙ্গনে দুর্বৃত্তদের প্রবেশাধিকার বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

শুধু নির্বাচনী অঙ্গনই নয়, আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনও আজ বহুলাংশে দুর্বৃত্তদের দখলে। রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দুর্বৃত্তদের দখল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশে সকল বড় বড় দুর্নীতি ও অপকর্ম বর্তমানে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়াই সংগঠিত হয়ে থাকে। বস্তুত সকল বড় দুর্নীতিই আমাদের দেশে এখন এক ধরনের রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীর আঁতাতেরই ফসল। এসব রাজনীতিবিদদের অনেকেই এখন পেশিশক্তির মালিকদেরও আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন। আশঙ্কার কথা যে, শুধু কেন্দ্রেই নয়, প্রান্তিকেও এখন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন লাগামহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর বড় কারণ “উইনার টেইকস্ অল' বা সবকিছুই বিজয়ীদের করায়ত্ত নীতির চর্চা। এই অপচর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফায়দাভিত্তিক রাজনীতি। চাঁদাবাজি এবং দখলদারিত্ব এখন নিত্তনৈমত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশে খুব কম মানুষই নীতি-আদর্শের জন্য রাজনীতি করে, ফায়দাভিত্তিক রাজনীতি এ অপচর্চারই অন্যতম কারণ। রাজনীতির এখন উদ্দেশ্যই হয়ে গেছে কিছু পাওয়া, দেওয়া নয়। অর্থাৎ রাজনীতি আজ জনসেবার পরিবর্তে লাভজনক ব্যবসায়ে পরিণত হয়ে পড়েছে, যা জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ না দেওয়া, দলে গণতন্ত্রের চর্চা, দলের আর্থিক স্বচ্ছতা, অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন বিলুপ্তির মাধ্যমে দলের লাঠিয়াল পালনের সংস্কৃতির অবসান, দলের বিদেশি শাখার বিলুপ্তি, নির্বাচনে, বিশেষত সংসদ নির্বাচনে দলের স্থানীয় সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে মনোনয়ন প্রদান, ইত্যাদি চর্চার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলসমূহকে দুর্বৃত্তমুক্ত করা সম্ভব। হলফনামার ছকে পরিবর্তন, কঠোরভাবে এর যাচাই-বাছাই এবং একইভাবে রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন ও নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা সংক্রান্ত আইন এবং পদ্ধতির সংস্কারের মাধ্যমেও নির্বাচনী ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে দুর্বৃত্তদেরকে দূরে রাখা সম্ভব হবে। আর নির্বাচনী ও রাজনৈতিক অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন করার মাধ্যমেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।

নির্বাচনী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন এবং টাকার খেলা একই সুতায় গাঁথা। রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় দুর্বৃত্তরাই নির্বাচনী অঙ্গনে প্রবেশ করে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হন। টাকাই, বিশেষত কালো টাকাই, তাদের অপকর্মের অন্যতম হাতিয়ার। টাকার খেলার ফলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আজ বহুলাংশে সিন্ডিকেটের মতো আচরণ করে। ফলে আমাদের রাজনীতি আজ হয়ে পড়েছে 'বেস্ট ডেমোক্রেসি মানি ক্যান বাই' বা টাকা দিয়ে কেনা যায় এমন গণতন্ত্র। আইনি কাঠামোর এবং পদ্ধতির পরিবর্তন ও তা কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অঙ্গনে প্রবেশ রুদ্ধ করা গেলে টাকার অশুভ খেলা আপনা থেকেই বহুলাংশে বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ কালো টাকা ব্যবহার করেই দুর্বত্তরা রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন, সংসদ সদস্য পদের জন্য মনোনয়ন কেনেন এবং টাকার বিনিময়ে ভোট কিনে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যান। এ ক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা, দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব, প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ এবং এগুলো কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই নির্বাচনী ও রাজনৈতিক অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন এবং টাকার খেলা বন্ধ করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: নির্বাচনী ও রাজনৈতিক অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন করে এবং টাকার অশুভ প্রভাবের অবসান ঘটিয়ে আমাদের দেশে জনগণের সম্মতির শাসন তথা গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কারণ সাংবিধানিকভাবে আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনই নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। বস্তুত নির্বাচন কমিশনই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কাস্টোডিয়ান বা তত্ত্বাবধায়ক। এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য আমাদের সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে অগাধ ক্ষমতাও দিয়েছে [আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাশেম, ৪৫ ডিএলআর (এডি) (১৯৯৩)]। একইসঙ্গে পদচ্যুত করার ব্যাপারেও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ন্যায় কমিশনের সদস্যদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কমিশন অতীতে তার দায়িত্ব সব ক্ষেত্রে সঠিকভাবে পালন করতে পারেনি, যার মূল কারণ হলো সঠিক ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন সব সময় গঠিত হয়নি। তাই ভবিষ্যতে নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত রাখতে হলে নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়াকেও বিতর্কমুক্ত করা আবশ্যক। আরও আবশ্যক কমিশনের ক্ষমতার পরিধিও সুস্পষ্ট এবং কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি করা। অতীতের ন্যায় জালিয়াতির নির্বাচন করে যাতে কেউ পার পেয়ে যেতে না পারে সে জন্য কমিশনকে দায়বদ্ধও করতে হবে। অর্থাৎ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে সবল, সচল, সক্রিয় ও দায়বদ্ধ করতে হবে ।

‘সিভিল সোসাইটি' বা নাগরিক সমাজও একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। নাগরিক সমাজ সক্রিয়, সোচ্চার ও প্রতিবাদী হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ সুগম হয়। বস্তুত নাগরিক সমাজ ‘ওয়াচ ডগ' বা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে কাজ করতে পারে। স্বাধীন পর্যবেক্ষক হিসেবে তারা নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে । তারা ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনী প্রচারণা, ভোটগ্রহণ এবং ফলাফল ঘোষণার প্রতিটি ধাপে তদারকি করতে পারে, যাতে কোনো অনিয়ম বা কারচুপি না ঘটে। নির্বাচনের দিন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ভোটকেন্দ্রে পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করে যেকোনো অনিয়ম নথিভুক্ত করে নির্বাচনে কারচুপি প্রতিরোধ করতে পারে। এছাড়াও নাগরিক সমাজ নাগরিকদেরকে সচেতন ও সক্রিয় করে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পরিচ্ছন্ন করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনে কারসাজি নিরুৎসাহিত এবং নির্বাচনের গুণগত মান সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রদানের মাধ্যমে নির্বাচনের বিভিন্ন ত্রুটি উত্তরণে সহায়তা করতে পারে। এছাড়াও তারা ভোটারদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যে নানা ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, যাতে নাগরিকরা তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায় এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দ্বারা বিভ্রান্ত বা প্রতারিত না হয়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে নাগরিক সমাজ অনেক ক্ষেত্রে ওয়াচ ডগের পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের ‘ল্যাপ ডগে’ বা পোষা কুকুরে পরিণতহয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে নাগরিক সমাজকে কার্যকর ।

একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে নিবর্তনমূলক আইন, বিধি-বিধান এবং প্রশাসনিক বিধি-নিষেধের অবসান ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যদিও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যমকে নাগরিক সমাজের অংশ বলে মনে করা হয় না।

কাঠামোগত সংস্কার: অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে সব চেয়ে বড় বাধা হলো নির্বাচনকালীন সরকার । আমাদের দেশে এ পর্যন্ত ১২টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে আটটি অনুষ্ঠিত হয় দলীয় সরকারের অধীনে এবং এসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলই পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। অন্য চারটি নির্বাচন হয়েছে নির্দলীয় অস্থায়ী কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এবং সে সব নির্বাচনে অব্যবহিত আগের ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, নির্বাচনকালীন দলীয় সরকার নির্বাচনী ফলাফলকে নিজেদের পক্ষে নিতে সক্ষম। তাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত অপরিহার্য । আনন্দের কথা যে, বর্তমান লেককের নেতৃত্বে অন্য চারজন বিশিষ্ট নাগরিকের একটি রিট মামলার প্রেক্ষিতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী – যে সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছে – এরই মধ্যে বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের নেতৃত্বে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ এর মূল অংশগুলো অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। পঞ্চদশ সংশোধনী পরিপূর্ণভাবে বাতিলের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা হয়েছে। এছাড়াও সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সম্পর্কিত প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে বর্তমান লেখকের ও অন্য চারজন নাগরিকের দায়ের করা রিভিউর উপর আপিল বিভাগের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্প্রতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সময়ে ভবিষ্যতে একটি নিরপেক্ষ সরকার দায়িত্বে থাকবে। এ অর্জনের ক্ষেত্রেও বর্তমান লেখকই মূখ্য ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ।

আমাদের সাংবিধানিক স্কিমের একটি বড় দুর্বলতা হলো প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স' ব্যবস্থার বা নজরদারিত্বের কাঠামোর অনপুস্থিতি, যা নির্বাহী বিভাগকে চরম ক্ষমতাধর এবং নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার সরকারকে স্বৈরাচারী দানবে পরিণত করতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নজরদারিত্বের কাঠামো, যা রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতাধরদের দায়বদ্ধ করে, যাতে তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত ও এর অপব্যবহার করে নাগরিকের অধিকার হরণ করতে না পারে। আমাদের বিদ্যমান সংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে রাজকীয় ক্ষমতাসম্পন্ন এক প্রধানমন্ত্রী সৃষ্টি হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাহীন ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা আরও নিরঙ্কুশ হয়েছে একইসঙ্গে সংসদে নেতা ও দলীয় প্রধান হওয়ার মাধ্যমে। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর দলীয় প্রধান হওয়ার কারণে আমাদের দেশে সরকার আর সরকারি দলের মধ্যে বিভাজন বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা এক অরাজকতামূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে । উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী তথা নির্বাহী বিভাগের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ব্যবহার করেই আমাদের অতীতের সরকারগুলো নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করতে এবং নির্বাচনী ফলাফলকে নিজেদের ঘরে তুলতে পেরেছে ‘পুরানো স্বৈরাচারী পথে হেটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছা যাবে না; (সমকাল, বিশেষ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫)। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সরকারের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ কার্যকর করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত এবং একইসঙ্গে একই ব্যক্তি যেন প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান না হতে পারেন এবং প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্বের পরিবর্তে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তা নিশ্চিত করা আবশ্যক ।

আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে একটি পর্বতপ্রমাণ বাধা হলো সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ, যার ফলে অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতায় লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ইত্যাদিকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত এবং এগুলোর নিয়োগ পদ্ধতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। দলনিরপেক্ষ ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগের মাধ্যমে এসকল প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার আরেকটি আকর্ষণও রয়েছে। শত রকমের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিরা নানা কলাকৌশল ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে পারেন । শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এসব ব্যক্তিদেরকে সম্ভাব্য অপকর্ম থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হবে, যা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।

গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য আরও প্রয়োজন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান । এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অর্থবিল ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সকল ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের দলের বিরুদ্ধে ভোটদানের সুযাগ প্রদান করা আবশ্যক। আরও আবশ্যক গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটি – যেমন, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি, পাবলিক এস্টিমেট কমিটি, সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত কমিটি ইত্যাদির – সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়া। উপরন্তু বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ প্রদান আবশ্যক ।

এধরনের কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্থায়ী ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানিকীকরণের এবং শাসন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ সুগম করবে। জবাবদিহিতা দুই প্রকারের হতে পারে - ভার্টিকাল বা নিম্নমুখী জবাবদিহিতা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে উঠলে প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনে প্রার্থীদেরকে ভোটারদের কাছে গিয়েভোট ভিক্ষা করতে হবে, যার মাধ্যমে নিম্নমুখী দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হবে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সৃষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাহী বিভাগ ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দায়দ্ধতা সৃষ্টি করতে পারবে, যার মাধ্যমে সমান্তরাল দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হবে ।

আমাদের সাংবিধানিক স্কিমে বিরাজমান এককক্ষ বিশিষ্ট সংসদও আমাদের নজরদারিত্বের কাঠামোর অসম্পূর্ণতা ও দুর্বলতারই প্রতিফলন। দ্বি- কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিশেষত সংখানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলে, অতীতের ন্যায় দলীয় স্বার্থে সহজে ও একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব হবে না। ফলে ‘ডেলিভারেটিভ' ডেমোক্রেসি তথা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন ও আনুষঙ্গিক সমস্যা সমাধানের পথ সুগম হবে। এছাড়াও একটি ‘ইউনিটারি' বা এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কিছুটা হলেও পরোক্ষভাবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটায় এবং এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে। কিন্তু আমাদের সম্পদ-বঞ্চিত দুর্বল স্থানীয় সরকার, যা দিন দিন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রেীকরণ ও অপব্যবহার রোধে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছে না । তাই আমাদের পুরো শাসনব্যবস্থাই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ও কুক্ষিগত করার জন্য সহায়ক, যা সুষ্ঠু নির্বাচন ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সহায়ক নয়।

সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক উত্তরণের তথা রাষ্ট্র মেরামতে জন্য প্রয়োজন হবে:

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দশ বছরে সীমিত করা (কারণ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকলে ব্যক্তিগত আনুগত্য সৃষ্টি হয়, যা ক্ষমতা কেন্দ্ৰীভূত হওয়ার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে);

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় লাগাম টানা, যাতে একই ব্যক্তি একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান না হতে পারেন; প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত করা;

প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রপতির জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং বাংলাদেশে ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ করা;

জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে শুধু প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি এবং এমন অনুমোদন লক্ষ্যে আয়োজিত সভায় বিরোধী দলীয় নেতা/উপনেতা উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং জরুরি অবস্থায় মৌলিক অধিকার খর্ব না করা; সংসদের উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ প্রদান এবং উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অপসারণের বিধান করা;

বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়া;

নির্বাহী বিভাগের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস, প্রিভিলেজ, অনুমিত হিসাব, সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে প্রদান করা;

সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ও অর্থবিল ছাড়া সকল ক্ষেত্রে দলের সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা;

সংসদ সদস্যদের অপকর্মের মাধ্যমে সংসদের মর্যাদাহানি তথা সংসদ অবমাননা যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি আইন প্রণয়ন করে ‘সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি' সম্পর্কিত বিশেষ সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে কার্যকর করা;

বিচার বিভাগের জন্য স্বাধীন সচিবালয় সৃষ্টি করা;

• সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদেরকে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা;

• সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা;

নিম্ন আদালতের ওপর তদাররিক দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যাস্ত করা,

সর্বদলীয় তথা রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানকে নিয়োগ প্রদান করা;

সর্বদলীয় তথা রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সকল সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে এবং ন্যায়পাল ও বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়োগ প্রদান করা;

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ স্থাপন করা এবং উচ্চকক্ষকে সংবিধান সংশোধন ও আইনপ্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপপূর্ণ ভুমিকা প্রদান করা;

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা (যেমন, সংসদ সদস্যদের বাইরেও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদেরকে নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য করা);

সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত এবং সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা;

অতীতে বাংলাদেশে মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যম একাধিকবার একদিনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, যখন নাগরিকরা অনেকটা নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন, কিন্তু তাতে স্থায়ী বা টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায়নি। কারণ, এতে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তির পরিবর্তে বহুলাংশে দুর্বৃত্তদের হতেই ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছে, যারা নিজের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী কল্যাণেই অর্জিত ক্ষমতা ব্যবহার করেছে। ফলে ক্ষমতার সঙ্গে যাদুর কাঠি জড়িত হয়ে পড়েছে (‘ক্ষমতা না টাকা বানানোর জাদুর কাঠি, ' প্রথম আলো, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫)। এভাবে রাজনীতি একটি নিছক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। বস্তুত রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ এবং ব্যবসায়ের রাজনীতিকরণ হয়েছে, যার ফলে রাজনীতি এবং ব্যবসা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আরও সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে, এর মাধ্যমে বিরাজনীতিকরণের পাশাপাশি সম্পদের উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

উপসংহার

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, অতীতের জালিয়াতি ও বিতর্কিত নির্বাচনের জন্য দায়ী মূলত নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারের পক্ষপাতদুষ্টতা, নির্বাচনী অঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন, রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন, টাকার অশুভ প্রভাব, নির্বাচন কমিশনের অপারগতা, নাগরিক সমাজের অক্ষমতা ও ক্ষমতার বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতা তথা নজরদারিত্বের কাঠামোর দুর্বলতা। তাই ভবিষ্যতে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করতে হলে এসব বিষয়গুলো প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং কতগুলো সুদূরপ্রসারী আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ আবশ্যক। ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫' স্বাক্ষর ও সরকারের পক্ষ থেকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫' জারির মাধ্যমে এসব সংস্কারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি 'ফাউন্ডেশনাল ইলেকশান' বা ভিত তৈরিকারী — গণতন্ত্রের ভিত তৈরিকারী – একটি নির্বাচন। শুধু সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই নয়, এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রূপান্তর তথা গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে ‘কন্সটিটিউয়েন্ট পাওয়ার' বা গাঠনিক ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে কতগুলো মৌলিক পরিবর্তন সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগকে ফলবতী করার জন্য প্রয়োজন হবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রচেষ্টায় সৃষ্ট ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫' এ অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা এ উদ্যোগকে সফল করা, যার জন্য প্রয়োজন হবে আসন্ন গণভোটের পক্ষে জনগণের সম্মতি অর্জন করা। আরও প্রয়োজন হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত অনেকগুলো সুপারিশ, বিশেষত নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা। আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে এ সকল সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি।

তবে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হবে না এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটবে না। এর জন্য আরও প্রয়োজন হবে সকল নাগরিকদের – বিশেষত রাজনীতিবিদদের গণতান্ত্রিক মুল্যবোধের চর্চা, গত কয়েক দশকে যার চরম অবক্ষয় ঘটেছে আমাদের দেশে । একইসঙ্গে অবক্ষয় ঘটেছে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। রাজনীতি এখন বহুলাংশে ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণের ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন নীতি-আদর্শের পরিবর্তে অর্থ ও পেশিশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রাজনীতিবিদরা একে অপরের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে ‘মর্টাল এনিমিতে' বা মরণশীল শত্রুতে পরিণত হয়েছে। যুক্ত-তর্ক ও নীতি-আদর্শের পরিবর্তে কালো টাকা, হুন্ডা-গুন্ডা ও সহিংসতা পরিণত হয়েছে রাজনীতির ভাষায়। এ থেকে উৎপত্তি হয় ছলে-বলে-কলে-কৌশলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি, যা সমাজকে চরমভাবে বিভাজিত করে ফেলেছে। ক্ষমতাসীনরা তাদের বৈধ সরকারি ক্ষমতা অবৈধভাবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন করে। তাই টেকসই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন। স্মরণ করা যেতে পারে যে, পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালে আমাদের দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে চিফ মিনিস্টার নূরুল আমিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকারের চরম বিপর্যয় ঘটেছিল। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭ আসনের মধ্যে জয় পেয়েছিল মাত্র নয়টি আসনে। নূরুল আমিনসহ তাঁর মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যের পরাজয় ঘটে। সেই নির্বাচনে আরপিও'র মতো আইনি কাঠামো এবং নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানও ছিল না। তবুও সেই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠেনি, যা আজ কল্পনাতীত। তাই সংস্কার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন হলেও, এটি যথেষ্ট নয় । এর জন্য আরও প্রয়োজন হবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও সদাচারণ ।

লেখক : নির্বাচন সংস্কার কমিশন প্রধান