চামড়া শিল্পের বিপর্যয় আওয়ামী সরকারের তৈরি আর্থিক সন্ত্রাস’
চামড়া শিল্পের বর্তমান বিপর্যয় কোনো স্বাভাবিক বাজার প্রক্রিয়া নয়, এটি বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা একটি আর্থিক সন্ত্রাস বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ গ্রীন পার্টি। রাজধানীর একটি মিলনায়তনে দলটির উদ্যোগে বিশেষজ্ঞ ও দায়িত্বশীলদের নিয়ে এক জরুরি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এই দাবি করা হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে দলের আহ্বায়ক রিদওয়ান হাসানের লেখা 'কোরবানির চামড়ার মূল্য : প্রেক্ষিত কওমি মাদরাসা' শীর্ষক কীনোট বক্তব্য পাঠ করেন সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ইউসুফ হাসান আম্মার। তিনি বলেন, গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কোরবানির চামড়া সংরক্ষণের জন্য ৩০ হাজার টন লবণ ফ্রি দেওয়া হয়েছিল। এই লবণ প্রকল্প ছিল একটা আইওয়াশ। সরকার এই ভুর্তুকি দিয়ে চামড়ার হকদার মানুষ বা মাদরাসাকে লাভবান করেনি, এটা মধ্যস্বত্বভোগী ও পুরনো সিন্ডিকেটকেই লাভবান করেছে। লবণে কোনো রিটার্ন নেই, এটা কেবল সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করবে।
কীনোট বক্তব্যে চামড়ার ন্যায্য মূল্য পাওয়ার নিমিত্তে বিকল্প প্রস্তাবনা হিসেবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মনোপলি মডেল পেশ করা হয়। এই মনোপলিতে দেশের উপজেলা পর্যায়ে একটি করে অস্থায়ী সরকারি চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে৷ সেই সাথে সরকারকে চামড়া সংগ্রহকারী বা মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে ধান-চালের মতো চামড়ার জন্য 'ন্যূনতম সহায়তা মূল্য গ্যারান্টি স্কিম' প্রদানের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। এতে করে মাদরাসার অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে লেদার ডেভেলপমেন্ট অথরিটির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ন্যায্য নিয়ন্ত্রণ লাভ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন বক্তারা।
গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির সদস্য সচিব সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০১৩ সালের পর থেকে চামড়ার বাজারে যে ধস, তা সরাসরি কওমি মাদরাসাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিল ৮০-৯০ টাকা, যা আজ নামিয়ে আনা হয়েছে ৫০-৬০ টাকায়। গত এক দশকে সব কিছুর দাম বাড়লেও চামড়ার দাম কেন অর্ধেক হয়ে গেল? কারণ, আওয়ামী সরকার জানত কওমি মাদরাসাগুলোর আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ আসে কোরবানির চামড়া থেকে। ব্র্যাকের সার্ভে অনুযায়ী, এই খাতের আয় কমিয়ে দিয়ে মাদরাসাগুলোকে অর্থাভাবে মুখ থুবড়ে ফেলাই ছিল আওয়ামী সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য।
দলের প্রশাসন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শারাফাত শরীফ বলেন, চামড়া শিল্প আজ ট্যানারী সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি। তাদের কারণে প্রতি বছর কওমি মাদরাসাগুলো অন্তত ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা কম আয় করছে। ২০১৩ সালের হিসেবে যেখানে আয় হওয়ার কথা ছিল ৭৮০ কোটি টাকা, সেখানে বর্তমানে তা মাত্র ৪৭০ কোটি টাকায় ঠেকানো হয়েছে। অল্প কয়েকজন ট্যানারি মালিকের হাতে এই বাজার জিম্মি করে রাখা হয়েছে যাতে মাদরাসাগুলো তাদের দামেই চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়। বিকল্প হিসেবে মাদরাসাগুলোকেও চামড়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে হবে।
বৈঠকে আবুবকর সিদ্দিক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম স্থিতিশীল থাকলেও বাংলাদেশে গত ১০-১২ বছর ধরে যে নাটকীয় দরপতন চলছে, তা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। এই সিন্ডিকেট এখনো প্রবলভাবে সক্রিয় এবং বর্তমান সরকারকে এই আওয়ামী লিগ্যাসি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠক থেকে বাংলাদেশ গ্রীন পার্টি সরকারের কাছে দাবি জানায়, লবণ বিতরণের মতো উপশমমূলক লোক দেখানো কাজ বন্ধ করে চামড়া শিল্পকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় নিতে হবে। সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোর ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে রাজপথে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এ সময় গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির প্রশাসন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শারাফাত শরীফ, আবুবকর সিদ্দিক, ওমর ফারুক জুবায়ের ও অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সম্পাদক হাফেজ কেফায়েত। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আশরাফ আলী কোব্বাদী ও মো. মিজানুর রহমান।
প্রসঙ্গত, ‘বাংলাদেশ গ্রিন পার্টি’ একটি নতুন রাজনৈতিক দল। নির্বাচনের আগে ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্টে এক অনুষ্ঠানে দলটির নাম ও স্লোগান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে দলের আহ্বায়ক রিদওয়ান হাসান বাংলাদেশ গ্রিন পার্টির নাম ঘোষণা করেন এবং স্লোগান হিসেবে তুলে ধরেন ‘ইনসাফ ও প্রকৃতির পাহারাদার’।