কালাইয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ৩৪ লাখ টাকা অনাদায়ি, ঋণ বিতরণে অনিয়ম

Agrani Bank's 3.4 million taka unpaid in Kalai
বিজয়বাংলা নিউজডেক্স : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:০৩ অপরাহ্ন সারা বাংলা
বিজয়বাংলা নিউজডেক্স : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:০৩ অপরাহ্ন
কালাইয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ৩৪ লাখ টাকা অনাদায়ি, ঋণ বিতরণে অনিয়ম
__সংগৃহীত ছবি

কৃষিখাতে অর্থায়নের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে চরম পদ্ধতিগত দুর্বলতা ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে জয়পুরহাটের অগ্রণী ব্যাংকের কালাই শাখায়। প্রায় আট বছর আগে বিতরণ করা কৃষিঋণের ৪০ জন গ্রাহকের প্রায় ৩৪ লাখ টাকা এখনো অনাদায়ি রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে বারবার তাগাদা এবং চূড়ান্ত লাল নোটিশ পাঠিয়েও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

‎ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে কালাই শাখা থেকে পাঁচ শতাধিক কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়। পুরো ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলামের সরাসরি অনুমোদনে। এই ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালার তোয়াক্কা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল দালালের মাধ্যমে এসব ঋণ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও ছবি ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে। ঋণ বিতরণের সময় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট বা তদারকি ব্যবস্থা এই অস্বাভাবিকতা ধরতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, যার প্রমাণ মেলে ২০১৯ সালে।

ঋণ বিতরণের দুই বছর পর গোলাম মোস্তফা নামে এক গ্রাহকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রথমবার ব্যাংকের টনক নড়ে। ২০১৯ সালের মার্চে অভ্যন্তরীণ তদন্তে এই অনিয়মের বিষয়টি উন্মোচিত হয়। আর ওই বছরই শাখা ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম অবসরে যান। তবে তার অবসরকালীন সুবিধার সব টাকা কেটে নিয়ে ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) হিসেবে আটকে রাখা হয়, যা বর্তমানে সুদ-আসলে প্রায় ৩২ লাখ ৪০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য কৃষকদের বাড়িতে লাল নোটিশ পাঠালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অনেক কৃষক ঋণ পরিশোধে অনীহা দেখাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ সরাসরি দাবি করছেন যে, তারা কখনোই ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নেননি।

ঋণের এই অর্থ গত আট বছর ধরে আদায় না হওয়ায় সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যাংক। ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ওই সময়ের শতাধিক কৃষিঋণ খেলাপি রয়েছে। তবে ৫৩ জন কৃষকের ঋণ বিতরণে অনিয়মের প্রমাণ মিললেও তা সরাসরি জালিয়াতি কিনা, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্ত চলাকালীন ১৩ জন গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপকের চেষ্টায় তাদের ঋণ পরিশোধ করা হয়। এখনো ৪০ জন তাদের ঋণ পরিশোধ করেননি। সাবেক শাখা ব্যবস্থাপকের এফডিআরে জমা থাকা অর্থ সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

কালাই উপজেলার আঁওড়া মহল্লার ভ্যানচালক পুতুল চন্দ্র জানান, ভ্যান কেনার জন্য ঋণ পাওয়ার আশায় এক দালালের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি জমা দিয়েছিলেন। তবে পরে ঋণ পাননি। কিন্তু সম্প্রতি তার নামে ৫০ হাজার টাকার ঋণের লাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সুদসহ সেই ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার ২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

‎অগ্রণী ব্যাংকের কালাই শাখার ব্যবস্থাপক সাব্বির আহাম্মেদ বলেন, খেলাপি গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের জন্য লাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ জন গ্রাহক বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করছেন। সংশ্লিষ্ট ঋণগুলো ২০১৭ ও ২০১৮ সালে বিতরণ করা হয়েছিল এবং সেগুলো তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক অনুমোদন করেছিলেন।

‎এ বিষয়ে সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি ৭ থেকে ৮ বছর আগের। ব্যাংক সেই সময়কার ১২০ জন গ্রাহকের ঋণের টাকা উত্তোলন করতে পারেনি। আমি সেই টাকা উত্তোলনের জন্য মাঠে যাচ্ছি। জুলাই পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। আশা করি সকল টাকা উত্তোলন হবে।

তিনি বলেন, সেই সময় কৃষিঋণ বিতরণে কর্তৃপক্ষের চাপ ছিল। ঋণ বিতরণে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম থাকতে পারে, তবে কোনো জালিয়াতির ঘটনা ঘটেনি। অনিয়মের অভিযোগে কর্তৃপক্ষ আমার অবসরের টাকা কেটে ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছে। এখন আমার সেই টাকা সমন্বয়ের সুযোগ খোঁজা হচ্ছে। তবে ঋণের টাকা আদায় হলে এসব কিছুই হবে না।

অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাট আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) জুলফিকার আলী আকন্দ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ২০১৯ সালে অনিয়মের বিষয়টি সামনে এলে ওই ব্যবস্থাপকের পেনশনের টাকা কেটে এফডিআর করে রাখা হয়। ওই টাকা ৩২ লাখ ৪০ হাজার হয়েছে।

তিনি বলেন, ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের অনেকের জমির দলিল, চেকসহ অন্যান্য কাগজপত্র ব্যাংকে রয়েছে। কিন্তু গ্রাহকরা যে পরিমাণ ঋণ পাওয়ার কথা, সেটি পাননি। এমন অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে। আবার অনেক গ্রাহক ঋণের কথা অস্বীকার করছেন। তবে তারা কেউ লিখিত অভিযোগ বা আবেদনও দেননি। এই পুরো ঘটনাটি বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও পৃথকভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।