স্বস্তির বৃষ্টির ভোগান্তিতে জনজীবন
Public life suffers from the relief rain
গত বছর চট্টগ্রাম ডুবল না, এবার কোনো ডুবল'- এই রকম একটা প্রশ্ন অনেকেই করছেন। উত্তর হলো, গত বছর খুবই নিয়মিত এবং পরিমিত বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে চট্টগ্রাম ডুবেনি। উজানের ঢল আসেনি বলে হাওর ডুবেনি।
কিন্তু প্রকৃতির এই অনুগ্রহকে সবাই মিলে বিরাট সফলতা মনে করেছিলেন। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বারবার বন্যা, জলাবদ্ধতার উদাহরণ দিয়ে বলা হচ্ছিল, শেখ হাসিনার সময়ে দুর্নীতি হতো বলে এমন হতো। আমরা, কয়েক মাসে কাজ করে উল্টে ফেলেছি। তাই সব সমাধান হয়ে গেছে।
এল-নিনোর প্রভাবে ২০২৪ থেকে আগের বছরগুলোতে প্রকৃতি ছিল আউলা ঝাউলা। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই, জুলাই মাসে ঢাকা শহরের গড় বৃষ্টিপাত হল ৩৭১ থেকে ৩৭৬ মিলিমিটার। আর গড়ে বৃষ্টি হয় ১৫ থেকে ২২ দিন। কিন্তু ২০২৪ সালে মাত্র ৪ দিনে ৭০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। মানে প্রচুর গরম। কিন্তু যেদিন বৃষ্টি হয়েছে, সেদিন শহর ডুবে গেছে। একই কারণে ২০২৩ সালে জলাবদ্ধতা হয়েছে। ওই বছরের আগস্টে তো চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল।
২০২৫ সালে জুলাই মাসে ঢাকায় ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল ২৭ দিনে। মানে প্রতিদিন অল্প অল্প করে বৃষ্টি হয়েছে। গরমও হয় নাই। আবার বন্যায়ও হয়নি । এটা হয়েছিল লা-নিনা এবং আরও কিছু কারণে।
এবার সেই 'সুসময়' চলে গেছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের শুষ্ক এপ্রিল। এপ্রিল মাসে গড় বৃষ্টিপাত ১৫০ মিলিমিটার। কিন্তু ২০২৪ সালে হয়েছিল মাত্র ১ মিলিমিটার। ২০২৩, ২০২২ সালেও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টি হয়েছি এপ্রিল। ফলে প্রচুর গরম এবং ব্যাপক লোডশেডিং ছিল। আপনাদের হয়ত মনে আছে, তখন নিয়মিত খবর হতো, রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছে, রেললাইন বেঁকে যাচ্ছে।
২০২৫ সালে এপ্রিলে ঢাকায় ১৭২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল ১১ দিনে। ফলে গরম বা বন্যা কোনোটাই ছিল না। গরম না থাকায় লোডশেডিং ছিল না। কিন্তু সরকার ধরে নিয়েছিল, সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে। খুব তৃপ্তিও দেখাচ্ছিল।
কিন্তু এবারের এপ্রিল মাস ২০২৪ সালের মত শুষ্ক শুরু হতেই, ক্রেডিট শেষ।
এল-নিনো ফিরে আসায়, গরমও ব্যাপক ভোগাচ্ছিল। এর মধ্যে লঘুচাপের কারণে বৃষ্টি এলো, তা চট্টগ্রাম, কুমিল্লা এবং হাওয়া এলাকায় তা ভারী বর্ষণে পরিণত হয়েছে। ফলে স্বস্তির বৃষ্টি ভোগান্তি হয়ে হয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের মেয়র সাহেব গতবার প্রচুর ভাব নিয়েছিলেন। বলছিলেন, মাত্র ৭-৮ মাসে অবস্থা বদলে ফেলেছেন। কিন্তু এবার বৃষ্টি আসতেই ভাব শেষ। এখন হাঁটু পানিতে ঘুরে বলছেন, সিডিএ এর চেয়ারম্যান কই?
কথা হল, এবার যে আবহাওয়ার গতবারের মত অনুকূলে থাকবে না, এগুলো আরও মাসখানেক আগেই জানা যাচ্ছিল পূর্বাভাসে। কিন্তু না শহরের পানি নিষ্কাশণের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, না ছিল হাওরের ধান আগাম কাটার প্রস্তুতি। ১০-১২দিন আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্কতা দিয়ে ধান কাটতে বলেছিল। কিন্তু গতবারের মত সব ঠিক থাকবে আশায় কেউ কিছু করেনি।
হাওরের সরকার যেসব হার্ভেস্টর দিয়েছে, এগুলো অনেকগুলো বন্ধ সার্ভিসিং না থাকায়। ডিজেলের অভাবে এবার এসব মেশিন পুরোদমে চালানো যায়নি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি, সরকার প্রশানকে অ্যাকটিভ করে সব হার্ভেস্টরের ব্যবহার নিশ্চিত করত, পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ দিত, তাহলে হয়ত ক্ষতি অনেকখানি কমানো যেতো।
তবে চট্টগ্রামের পানি নামানো যেতে না। এটা ১০-১২ দিনের কাজ না। এখান থেকে কাজ শুরু করলেও, আরও কয়েক বছর লাগবে। যতদিন খাল, নদী দখলমুক্ত না হবে, ততদিন কাজ হবে না। মাঝেমাঝে কয়েক বছর নিয়মিত ও পরিমিত বৃষ্টি হলে, বন্যা হবে না। তখন সরকার ও মেয়র ক্রেডিট নেবে। আবার যেই বছর আবহাওয়া বেতাল করবে, সেই বছর বন্যা হবেই। তখন বলবে, সব দোষ্ট কেষ্ট বেটার।