আমি না খাইয়া থাকলেও কারো কাছে হাত পাতি না

Even if I don't eat, I don't touch anyone
অনলাইন ডেস্ক ০১ মে ২০২৬ ০১:১২ অপরাহ্ন সারা বাংলা
অনলাইন ডেস্ক ০১ মে ২০২৬ ০১:১২ অপরাহ্ন
আমি না খাইয়া থাকলেও কারো কাছে হাত পাতি না
--সংগৃহীত ছবি

সকাল গড়িয়ে তখন প্রায় দুপুর। নারায়ণগঞ্চের সিদ্ধিরগঞ্জে পাইনাদী এলাকার একটি পাঁচ তলা ভবনের ভাঙা ইটের স্তূপ। তার পাশেই মাটিতে পাতা পুরোনো বস্তা। তারই ওপর বসে ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে একের পর এক ইট ভাঙছেন ক্ষীণদেহী এক বৃদ্ধা। বয়স ৭০ ছুঁইছুঁই। রোদে পোড়া মুখ, কাঁপা হাত, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। তবু হাত থামে না। কারণ হাত থামলেই থেমে যাবে ওষুধ আর খাবারের ব্যবস্থা।

এই বৃদ্ধার নাম আনোয়ারা বেগম (৬৯)। বাড়ি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই গ্রামে। প্রায় ১৪ বছর ধরে শ্রমজীবী জীবন কাটছে তার। আর স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে ইট ভাঙাই হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

ইট ভাঙতে ভাঙতেই আনোয়ারা বেগম বলছিলেন, আমি না খাইয়া থাকলেও কারো কাছে হাত পাতি না। আমার শরম করে। কাম করলে টাকা পামু, টাকা পাইলে খাওন আর ওষুধ পামু। না করলে কিছুই পামু না।

আনোয়ারা বেগমের জীবন শুরু থেকেই সংগ্রামের। নিজের চাচাতো ভাই রেফাজউদ্দীন ভূঁইয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তিস্তা নদীর ভাঙনে একসময় হারিয়ে যায় তাদের সহায়-সম্পদ।

তিনি বলেন, আমাদের সহায় সম্পদ বড় তিস্তা নদী ভাইঙা লইয়া গেছে। সেখানে কাম-কাজও তেমন আছিল না। পরে দেবরের পরামর্শে আমি আর আমার স্বামী ঢাকায় আইসা পড়ি।

ঢাকায় এসে প্রথমে রিকশা চালাতেন তার স্বামী। পরে ২০০০ সালে সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেন তারা। স্বামী লেবারের কাজ করতেন, রিকশাও চালাতেন। অল্প আয়ে কষ্ট হলেও ভালোই চলছিল সংসার।

কিন্তু ২০০৮ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন রেফাজউদ্দীন। ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে থাকে তার খাদ্যনালী। চিকিৎসা করাতে গিয়ে যা ছিল সব ফুরিয়ে যায়। একসময় বিছানায় পড়ে যান তিনি। স্বামীর চিকিৎসা আর সংসার চালাতে তখনই ইট ভাঙার কাজ শুরু করেন আনোয়ারা বেগম। ‘তহন ৪০ টাকা মজুরি পাইতাম। সারাদিন কাম কইরা সংসার চালাইতাম, স্বামীর ওষুধ কিনতাম’, বলছিলেন তিনি। চার বছর অসুস্থ থাকার পর ২০১২ সালে মারা যান রেফাজউদ্দীন ভূঁইয়া।

আনোয়ারা বেগমের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি কষ্ট ঝরে সন্তানদের কথা বলতে গিয়ে। আমার দুইটা ছেলে হইছিল। একটা গর্ভেই মারা গেছে। আরেকটা ২২ দিন বাঁইচা আছিল। পরে একটা ১৫ দিনের মাইয়া পালক আনছিলাম। এক বছর পর জ্বরে ওইডাও মারা গেল।

কথাগুলো বলতে বলতে কিছু সময় চুপ করে থাকেন তিনি। তারপর আবার হাতুড়ি চালাতে শুরু করেন। স্বামী নেই, সন্তান নেই। এখন পৃথিবীতে বলতে গেলে তার কেউ নেই। এক ভাই থাকলেও আলাদা থাকেন তিনি।

স্বামী মারা যাওয়ার পর পাইনাদীতে খালি জায়গায় ছাপড়া ঘর তুলে কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে থাকতেন আনোয়ারা। পরে সবাই চলে গেলে একা হয়ে পড়েন।

পাশের বাড়ির মালিক রব্বানী সাহেবের স্ত্রী তাকে নিজেদের বাড়িতে থাকার জায়গা দেন। কয়েক বছর ভাইয়ের সঙ্গে থেকেছেন। কিন্তু ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর সেখান থেকেও আলাদা হয়ে যান। এখন প্রায় আট বছর ধরে রব্বানী সাহেবদের বাড়ির একটি কক্ষে একাই থাকেন তিনি।

‘এহন বেশি কাম করতে পারি না। রব্বানী সাব প্রতি মাসে চাইল কিন্না দেয়। ওইগুলা খাই। টুকটাক কাম কইরা যা পাই, ওই দিয়া ওষুধ কিনি’, বলেন আনোয়ারা।

বয়সের ভার আর অসুস্থতায় আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তবু প্রতিদিন ইট ভেঙে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে ওষুধ আর খাবার। দৈনিক আয় কত—জানতে চাইলে তিনি বলেন, এহন ১৫০ টাকার মতো কামাইতে পারি। এর বেশি পারি না।

আলসারসহ নানা রোগে ভুগছেন তিনি। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। একটা ওষুধের ফাইল আড়াইশ টাকা। আরেকটার দাম ৪৮০ টাকা, বলতে বলতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি।

নেই জাতীয় পরিচয়পত্র, মেলেনি বয়স্ক ভাতা

এই বয়সেও সরকারি কোনো সহায়তা পান না আনোয়ারা বেগম। কারণ তার জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। তিনি জানান, ২০০৮ সালে ভোটার হওয়ার জন্য তথ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন পরিচয়পত্র দেওয়া হয়, সেদিন কাজের কারণে যেতে পারেননি। পরে স্বামীর অসুস্থতা আর দারিদ্র্যের চাপে আর তোলা হয়নি সেই কার্ড। হারিয়ে গেছে ভোটার স্লিপও।

এক জায়গায় যোগাযোগ করছিলাম। হেরা কয় আগারগাঁও যাইতে। আমি আগারগাঁও চিনি না। একলা যাইতেও পারি না, বলছিলেন তিনি। তার প্রশ্ন, আইডি কার্ড দিয়া কী হইব? আমারে কে বয়স্ক ভাতার কার্ড কইরা দিব?

বিশ্ব শ্রমিক দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে আনোয়ারা বেগমের উত্তর ছিল খুবই সরল। শ্রমিক দিবস আমি বুঝি না। আমি বুঝি, কাম করলে টাকা পামু। টাকা পাইলে খাওন আর ওষুধ পামু।

স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম রাব্বানী গণমাধ্যমকে বলেন, আনোয়ারা খালাকে অনেক বছর ধরেই দেখি। মানুষটা খুব আত্মসম্মানী। কষ্টে থাকলেও কখনও কারো কাছে চাইতে দেখিনি। বয়স হওয়ার কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তারপরও নিজের খরচ চালানোর জন্য ইট ভাঙেন। আমরা যতটুকু পারি সহযোগিতা করি। আমার স্ত্রীই প্রথম উনাকে একা ছাপড়া ঘরে থাকতে দেখে আমাদের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এখন উনি আমাদের এখানেই থাকেন। একজন বৃদ্ধ নারী এই বয়সে ইট ভেঙে জীবন চালাচ্ছেন, এটা সত্যিই কষ্টের।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ গণমাধ্যমকে  বলেন, আনোয়ারা বেগমের মতো একজন বৃদ্ধ নারী এই বয়সে ইট ভেঙে জীবিকা চালাচ্ছেন। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়, এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় বাস্তবতা ও সতর্কবার্তা। একজন নারী সারা জীবন সংগ্রাম করার পর বার্ধক্যে এসে যেন অন্তত খাবার ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পান, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তার এনআইডি ও বয়স্ক ভাতার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করব। সমাজের বিত্তবান মানুষদেরও এ ধরনের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।