প্রতিবাদ করায় মামলা, তারপর জেল— বদলগাছীর বলরামপুরে কৃষক পরিবারগুলোর আহাজারি!

Case filed for protesting, then jailed
প্রতিনিধি, বদলগাছী (নওগাঁ): ১৫ মে ২০২৬ ০৭:২৮ অপরাহ্ন সারা বাংলা
প্রতিনিধি, বদলগাছী (নওগাঁ): ১৫ মে ২০২৬ ০৭:২৮ অপরাহ্ন
প্রতিবাদ করায় মামলা, তারপর জেল— বদলগাছীর বলরামপুরে কৃষক পরিবারগুলোর আহাজারি!
একটি রাস্তা, দুই পক্ষ, আর ৬ জনের জেল— থমকে গেছে গ্রামের স্বাভাবিক জীবন!

মাঠজুড়ে সোনালী বোরো ধান পেকে উঠেছে। কৃষকের ঘরে এখন থাকার কথা আনন্দ আর উৎসবের আমেজ। অথচ নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বিলাশবাড়ী ইউনিয়নের বলরামপুর গ্রামের একটি পাড়াজুড়ে এখন বইছে আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা আর কান্নার রোল। কয়েক দশকের পুরোনো একমাত্র চলাচলের রাস্তায় ইটের প্রাচীর তুলে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে ১১টি পরিবারকে। আর সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো দ্রুত বিচার আইনের মামলায় জড়িয়ে এখন জেলহাজতে দিন কাটছে গ্রামের ৬ জন খেটে খাওয়া মানুষের।

জানা গেছে, গত ২২ এপ্রিল রোজিনা বেগম নওগাঁ দ্রুত বিচার আদালতে একটি এজাহার দাখিল করেন। আদালত বদলগাছী থানাকে অভিযোগটি গ্রহণের নির্দেশ দিলে গত ৯ মে দ্রুত বিচার আইন ২০০২-এর ৪(১) ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। এরপর গত সোমবার (১১ মে) মামলায় জামিন চাইতে গেলে আদালত ৬ জনকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় পুরো বলরামপুর গ্রামে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নীরবতার সুযোগে প্রভাবশালী একটি পক্ষ দীর্ঘদিনের চলাচলের রাস্তাটি দখল করে দেয়াল নির্মাণ করছে। ফলে অবরুদ্ধ পরিবারগুলো এখন বাড়ি থেকে বের হওয়া, কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া এমনকি স্বাভাবিক চলাচল থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের উত্তর মাঠে যাতায়াত, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও মসজিদে যাওয়ার একমাত্র প্রধান রাস্তাটির মাঝখানে ইটের প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। দেয়াল নির্মাণের জন্য গভীর বক্স খনন করায় রাস্তাটির বড় অংশ ধসে পড়েছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রায় ৪০-৫০ বছর ধরে এই রাস্তা ব্যবহার করে আসছে পুরো গ্রাম। কিন্তু হঠাৎ করেই রাস্তার মাঝখানের জমি নিজেদের ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে রোজিনা বেগম ও তার পরিবার দেয়াল নির্মাণ শুরু করেন। এতে পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ১১টি পরিবার।

সামনে বোরো ধান কাটার মৌসুম হওয়ায় গত ২০ এপ্রিল গ্রামবাসী নিজেদের উদ্যোগে মাত্র দুই ফিট মাটি কেটে একটি ভ্যান চলাচলের পথ তৈরি করেন, যাতে অন্তত মাঠের ধান ঘরে তোলা যায়। আর সেই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে ১৯ জন গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।

স্বামীকে হারিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া গৃহবধূ তানজিলা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,যে রাস্তা দিয়ে আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে চলছি, আজ সেখানে দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। আমরা শুধু ধান আনার জন্য একটু মাটি সমান করেছিলাম। এই অপরাধে ৬ জন মানুষ আজ জেলে! আমরা এখন কোথায় যাব, কার কাছে বিচার চাইব?

আরেক ভুক্তভোগী ফারুক বলেন,আমাদের ঘরে ধান আসবে, কিন্তু প্রাচীরের কারণে ভ্যান বা ধান মাড়াইয়ের মেশিন ঢোকানোর কোনো উপায় নেই। পাকা ধান মাঠে পড়ে আছে। উল্টো আমাদেরই আসামি বানিয়ে জেলে পাঠানো হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ জানান, নিয়ম অনুযায়ী রাস্তার জন্য অন্তত কিছু জায়গা ছাড়ার কথা থাকলেও এক ইঞ্চি জায়গাও রাখা হয়নি। এখন গ্রামের মানুষকে প্রধান সড়কে গাড়ি রেখে মাথায় করে মালপত্র বাড়িতে নিতে হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী রোজিনা বেগম বলেন, জায়গাটি আমাদের ব্যক্তিমালিকানাধীন। আইনগত অধিকার থেকেই আমরা দেয়াল তুলছি। আগে গ্রামবাসীকে ছাড় দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা তিন ফিট জায়গা দাবি করে হুমকি-ধমকি ও মারধর করেছে। বাধ্য হয়েই মামলা করেছি।

তবে বিলাশবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান কেটু বলেন, রাস্তাটি ওই পরিবারগুলোর একমাত্র চলাচলের পথ। আমরা দুই পক্ষকে বসিয়ে সমঝোতা করেছিলাম এবং সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই রাস্তায় মাটি কাটা হয়েছিল। কিন্তু পরে মামলা করে ৬ জন মানুষকে জেলে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি গ্রামেই সমাধান করা যেত।

বদলগাছী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, বাদী সরাসরি আদালতে মামলা করেছেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটি নথিভুক্ত হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।