পাম্পে পাম্পে ‘ডিজিটাল’ চুরি: টের পাচ্ছেন না গ্রাহকরা
গাড়ির ফুয়েল ট্যাংক ভরতে অর্ডার করার পর ফিলিং স্টেশনে ডিজিটাল ডিসপ্লের দিকে তাকিয়ে থাকেন গ্রাহকরা। মিটারে ৫ লিটার, ১০ লিটার কিংবা নির্দিষ্ট টাকার হিসাব মিলতে দেখলেই ধরে নেওয়া হয় ঠিক পরিমাণ জ্বালানিই সরবরাহ করা হয়েছে। কারণ, প্রযুক্তিনির্ভর এই ডিসপেন্সিং ইউনিটকে সাধারণ মানুষ প্রায় নির্ভুল বলেই বিশ্বাস করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে পরিচালিত বিএসটিআইয়ের অভিযানে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য– ডিজিটাল মিটারে সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও বাস্তবে গ্রাহকরা পাচ্ছেন কম তেল! অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে আরও নিখুঁত প্রতারণার অস্ত্র হিসেবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের দিনের মতো এখন আর প্রকাশ্যে যান্ত্রিক কারচুপি খুব বেশি হয় না। বর্তমানে প্রতারণার বড় অংশ হচ্ছে সফটওয়্যারভিত্তিক। ফলে একজন গ্রাহক বুঝতেই পারেন না যে তেল কম দেওয়া হচ্ছে। চুরির পরিমাণ লিটারপ্রতি কম মনে হলেও দিনে শত শত গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহকারী পাম্প মালিকদের কাছে দিনশেষে তা বিশাল অঙ্কের অবৈধ মুনাফায় পরিণত হয়।
প্রতিবছর ২০ মে বিশ্ব মেট্রোলজি (পরিমাপ) দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) দিবসটি উপলক্ষ্যে নানা কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু ওজনে বা পরিমাপে কম দেওয়া ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ কমই নেওয়া হয়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে মার্চ মাসে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। এ সময় অবৈধ মজুত ঠেকাতে সরকারের নির্দেশে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে অভিযান শুরু করেন বিএসটিআই কর্মকর্তারা। সেই অভিযানে গিয়ে তারা শুধু মজুত নয়, বরং ওজনে কম দেওয়ার ঘটনাও শনাক্ত করেন। কর্মকর্তাদের ভাষায়, অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ মজুতের চেয়েও ভয়ংকর ছিল ডিজিটাল কারচুপি। কারণ, এটি দীর্ঘদিন ধরে চলছিল, অথচ সাধারণ গ্রাহক তা টেরই পাচ্ছিলেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৪ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের গোসাইলডাঙ্গা এলাকার হাজী আবদুল আজিজ ফিলিং স্টেশনে অভিযান পরিচালনা করে চট্টগ্রাম বিএসটিআই অফিসের একটি দল। এতে প্রতিষ্ঠানটির একটি ডিজেল ডিসপেন্সিং ইউনিটে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম তেল সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই দিন একই এলাকার দাম্মাম ফিলিং স্টেশনেও একই অভিযোগে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
গত ১৮ মার্চ নগরের পাঁচলাইশ থানার নাসিরাবাদের বাদশা মিয়া অ্যান্ড সন্স পেট্রোল পাম্পের ডিসপেন্সিং ইউনিট যাচাই করেন বিএসটিআই কর্মকর্তারা। এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি ৫ লিটার ডিজেলে ১২০ মিলিলিটার কম সরবরাহ করছে। এ অপরাধে ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন-২০১৮ এর ২৯/৪৬ ধারায় প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। গত ১৯ মার্চ সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকার মা ফাতেমা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়ে দেখা যায়, প্রতি ৫ লিটার ডিজেলে ৪০ মিলিলিটার করে কম তেল দেওয়া হচ্ছে। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
গত ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, ডিজিএফআই এবং বিএসটিআই বিভাগীয় কার্যালয়ের সমন্বয়ে পরিচালিত এক অভিযানে নগরের কাটগড় এলাকার আম্বিয়া ফিলিং স্টেশনের ডিসপেন্সিং ইউনিট যাচাই করা হয়। সেখানে দেখা যায়, প্রতি ৫ লিটার অকটেনে ৭০ মিলিলিটার তেল কম দেওয়া হচ্ছে। ওজনে কারচুপির এ অপরাধে ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন-২০১৮ এর ২৯/৪৬ ধারায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
গত ৩০ মার্চ নগরের বন্দর এলাকার মেসার্স আনোয়ারা জাকারিয়া ফিলিং স্টেশনের ডিজেল ডিসপেন্সিং ইউনিটে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম তেল সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তাদের ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
৩১ মার্চ নগরের পাহাড়তলী এলাকায় স্পিড টেক প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি ফিলিং স্টেশনে অভিযান পরিচালনা করে চট্টগ্রাম বিএসটিআই অফিসের একটি দল। এতে প্রতিষ্ঠানটির একটি ডিজেল ডিসপেন্সিং ইউনিটে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম তেল সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
বিএসটিআই ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আধুনিক ডিসপেন্সিং ইউনিট মূলত সেন্সর, পালস জেনারেটর, কন্ট্রোল সার্কিট ও সফটওয়্যারের সমন্বয়ে কাজ করে। জ্বালানি প্রবাহিত হওয়ার সময় একটি সেন্সর নির্দিষ্ট পরিমাণ তরল প্রবাহকে ডিজিটাল সিগন্যালে রূপান্তর করে। সেই সিগন্যাল হিসাব করে ডিসপ্লেতে দেখানো হয় কত লিটার তেল দেওয়া হয়েছে।
কারচুপির ক্ষেত্রে মূলত এই হিসাব প্রক্রিয়াতেই হস্তক্ষেপ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ডিসপেন্সিং ইউনিটের মাদারবোর্ডে অতিরিক্ত ডেসিমাল চিপ বা পরিবর্তিত সার্কিট বসানো হয়। এতে মেশিনের সফটওয়্যার এমনভাবে কনফিগার করা হয় যে ডিসপ্লেতে ১ লিটার দেখালেও বাস্তবে সরবরাহ হয় কিছুটা কম। কোথাও কোথাও প্রতি লিটারে ২০ থেকে ৩০ মিলিলিটার কম সরবরাহ করা হয়, যা সাধারণভাবে বোঝা প্রায় অসম্ভব।
কিছু ক্ষেত্রে ক্যালিব্রেশন সফটওয়্যারে গোপনে পরিবর্তন আনা হয়। ডিসপেন্সিং ইউনিটের ভেতরের ‘পালস রেশিও’ সামান্য পরিবর্তন করে দেওয়া হয়, যাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক পালসকে বাস্তবের চেয়ে বেশি জ্বালানি হিসেবে গণনা করে মেশিন। ফলে ডিসপ্লেতে সঠিক হিসাব দেখালেও ট্যাংকে কম তেল যায়। কিছু অসাধু চক্র আবার রিমোট কন্ট্রোল বা গোপন সুইচ ব্যবহার করেও কারচুপি করে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অভিযানের সময় যাতে ধরা না পড়ে, সে জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় মেশিন ঠিকভাবে কাজ করে। কিন্তু ব্যস্ত সময়ে গোপনে কারচুপির মোড চালু করা হয়। এতে একই মেশিন কখনও সঠিক পরিমাণ তেল দেয়, কখনও কম দেয়।
বিএসটিআই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিদর্শক (মেট্রোলজি) বুলবুল আহমেদ জয় বলেন, সাম্প্রতিক অভিযানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের দেওয়া নিরাপত্তা সিল ঠিক পাওয়া যায়। তারা সফটওয়্যার সেটিংস এর ক্ষেত্রে জালিয়াতি করে। এজন্য আমরা আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করি। যাতে তারা টের না পায়। একই সঙ্গে ডিভাইসে যাতে কোনোভাবে হাত দিতে না পারে এটা নিশ্চিত করি। এরপর আমাদের সাথে থাকা ৫ বা ১০ লিটারের একটি স্ট্যান্ডার্ড পরিমাপক পাত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল পূর্ণ করি। পাত্রের গায়ের নিখুঁত রিডিং স্কেলের সাথে পাম্পের ডিজিটাল স্ক্রিনের রিডিং মিলিয়ে দেখলে ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে প্রমাণিত হয়। আমরা ১০ লিটারে সর্বোচ্চ ৩০ মিলিলিটার পর্যন্ত ছাড় দিই। এর চেয়ে বেশি কম হলে আমাদের সঙ্গে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা বিবেচনা করে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষকে জরিমানা করেন।
সফটওয়্যার জালিয়াতি ঠেকানোর উপায় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি ডিসপেন্সিং ইউনিটে থাকা সফটওয়্যারগুলো বিএসটিআইয়কে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে কারচুপি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তৈরি হবে। এটা অবশ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিষয়।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট