পুলিশের পোশাকে সরানো হয় অভিযুক্তকে ॥ তিন বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনায় রণক্ষেত্র চট্টগ্রাম

Chittagong, the battlefield in the rape of a three-year-old child
অনলাইন ডেস্ক ২২ মে ২০২৬ ১২:০০ অপরাহ্ন জাতীয়
অনলাইন ডেস্ক ২২ মে ২০২৬ ১২:০০ অপরাহ্ন
পুলিশের পোশাকে সরানো হয় অভিযুক্তকে ॥ তিন বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনায় রণক্ষেত্র চট্টগ্রাম
--সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় তিন বছরের এক শিশু কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করেছে চেয়ারম্যানঘাটা আবু জাফর রোড এলাকায়। অভিযুক্ত যুবককে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষুব্ধ লোকজন সড়ক অবরোধ, পুলিশের গাড়ি আটকে দেওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়। পরে একটি পুলিশ ভ্যানে আগুনও দেওয়া হয়। পরে পুলিশ অভিযুক্তকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে থানায় নিয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় তিন বছর বয়সী এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার বিকেলে তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে স্বজন ও স্থানীয়দের সন্দেহ হয়, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিকেল পাঁচটার দিকে রাস্তায় নেমে আসেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত যুবকের নাম মনির। তিনি স্থানীয় একটি ডেকোরেশন দোকানে কাজ করেন। তাদের অভিযোগ, মনির তাদের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকারও করেছেন। 

অভিযুক্ত মনির নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন বলে একটি তথ্য ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লেও এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

ভবন ঘেরাও, অভিযুক্তকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবি: 

বিকেল ৪টার দিকে স্থানীয়রা অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করে ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ নামের একটি ভবন ঘেরাও করে রাখেন। একপর্যায়ে ভবনটির কলাপসিবল গেট ভেঙে ফেলার চেষ্টাও করা হয়।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। অন্যদিকে অভিযুক্তকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা পথ আটকে দেয় এবং তাকে নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। বিকেল সাড়ে চারটা থেকে পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে স্থানীয়রা।

এ সময় উপস্থিত লোকজন চিৎকার করে বলতে থাকেন, “বাংলাদেশে বিচার নেই। ধর্ষককে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা মেরে ফেলব। তার বিচার আমরাই করব।”

বিকেলের পর থেকে পুলিশের সঙ্গে এলাকাবাসীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াও শুরু হয়। তারা পুলিশের গাড়ি ঘিরে রাখে। রাত আটটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ডগ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে সংঘর্ষ শুরু হয় পুরো এলাকায়। তখন অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে পারেনি পুলিশ।

পরে দফায় দফায় সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের দিকে ইট পাটকেল ছুঁড়ে মারেন স্থানীয়রা। রাতে এ ঘটনা আরও ছড়ালে বাকলিয়া এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। স্থানীয়রা গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে।

দফায় দফায় সংঘর্ষের এক পর্যায়ে রাত সাড়ে ১০টা থেকে স্থানীয় লোকজন বহদ্দারহাট-শাহ আমানত সেতু সড়কে চলে আসে। বিভিন্ন অলিগলি থেকে পুলিশের ওপর হামলা শুরু করেন। রাত ১১টার দিকে পুলিশ সদস্যদের বহনকারী একটি বড় ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়ে। সংঘর্ষে পুলিশ ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। 

এ সময় সংবাদ সংগ্রহ ও লাইভ সম্প্রচারের সময় সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে আহত হন চট্টগ্রাম প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার মামুন আবদুল্লাহ, নোবেল হাসান ও চ্যানেল২৪ এর রিপোর্টার আরিফুল ইসলাম তামিম।

জানা গেছে, নোবেল হাসানের হাত ও পায়ে আঘাত লেগেছে। মামুন আবদুল্লাহর কোমর ও পায়ে আঘাত লাগে। আহত দুই সাংবাদিককে প্রথমে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সংঘর্ষে স্থানীয় কয়েকজন যুবকও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিদ্যুৎ বন্ধ করে পুলিশের পোশাকে সরানো হয় অভিযুক্তকে: 

স্থানীয়দের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে রাত ১১টার পর এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময় অভিযুক্তকে ভবন থেকে বের করে পুলিশের পোশাক পরিয়ে কৌশলে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ের মধ্য দিয়েই বাকলিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এর আগে স্থানীয়দের জনরোষের মুখে বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করেও আটক ব্যক্তিকে নিয়ে এলাকা ছাড়তে পারেনি পুলিশ। পরে জনবল বাড়িয়ে কঠোর নিরাপত্তায় ওই সন্দেহভাজনকে নিয়ে বাকলিয়া এলাকা ছাড়তে পারে পুলিশ।

বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান জানান, অভিযুক্তকে থানায় আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

থানার সামনে বিক্ষোভ, পুলিশের গাড়িতে আগুন:

রাত ১১টার পর অভিযুক্তকে বাকলিয়া থানায় নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা। তারা শাহ আমানত সংযোগ সড়কে পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়।

রাত ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ জনতার একটি দল থানা ঘেরাও করতে মূল সড়কে পৌঁছে যায়। এ সময় কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালানোর ঘটনাও ঘটে। এসময় কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করেন স্থানীয়রা।

এদিকে এসব সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গিয়ে স্থানীয়দের তোপের মুখেও পড়েন কয়েকজন সাংবাদিক। আজকের পত্রিকার মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আব্দুল কাইয়ুমকে একটি কমিউনিটি সেন্টারের ছাদে বেশ কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে তিনি ফেসবুকে আটকে থাকার কথা জানালে তাকে উদ্ধার করা হয়।

গভীর রাত পর্যন্ত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে।

বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, বিকেলে ধর্ষণের অভিযোগ শুনে পুলিশ গিয়ে সন্দেহভাজনকে আটক করে। আমরা গিয়ে দেখি সেখানে দুই থেকে তিনশ লোক জড়ো হয়ে গেছে। তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায়। তারা অভিযুক্তকে মেরে ফেলতে চায়, দেশে তো আইন আছে!

তিনি বলেন, ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে দুষ্কৃতকারীরা জড়ো হয়ে আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। সিটিজেন ফোরামের সহায়তায় আমরা সেখান থেকে বের হয়ে আসামিকে হেফাজতে নিয়েছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, আত্মরক্ষার্থে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সুযোগে কৌশলে অভিযুক্তকে সরিয়ে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।