বদলগাছীতে ঈদ উপহারের চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ; ভিজিএফ জালিয়াতির ভিডিও ভাইরাল

VGF fraud video goes viral
প্রতিনিধি, বদলগাছী (নওগাঁ): ২২ মে ২০২৬ ০৪:৪২ অপরাহ্ন সারা বাংলা
প্রতিনিধি, বদলগাছী (নওগাঁ): ২২ মে ২০২৬ ০৪:৪২ অপরাহ্ন
বদলগাছীতে ঈদ উপহারের চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ; ভিজিএফ জালিয়াতির ভিডিও ভাইরাল
সংগৃহীত ছবি

সময় ও ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদগুলোর কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে হতদরিদ্র, অসহায় ও দুস্থদের মাঝে বিনামূল্যে ভিজিএফের চাল বিতরণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এরই মধ্যে আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদে ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়ম ও জালিয়াতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত উপকারভোগীদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে ভুয়া কার্ড বিতরণ, অন্যের নামে টিপসই দিয়ে চাল উত্তোলন এবং ওজনে কম চাল দেওয়ার মতো নানা অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে।

গতকাল ২২শে মে বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে জানা গেছে, যার হাতে ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া কার্ড বা টোকেন রয়েছে, যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাকেই চাল দেওয়া হচ্ছে। অথচ মাস্টাররোলে থাকা নামের সঙ্গে চাল গ্রহণকারী ব্যক্তির কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই জানেন না সরকারি তালিকায় তাদের নাম আছে কি না। আবার কেউ কেউ একাধিক কার্ড ব্যবহার করে চাল তুলছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সাড়ে ৮ কেজি থেকে সাড়ে ৯ কেজি পর্যন্ত চাল দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেই কম ওজনে চাল বিতরণ করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হতদরিদ্র ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,আমরা গ্রামের আসল গরিব মানুষ, অথচ কোনো কার্ড পাই না। আবার একেকজন ৪-৫টা কার্ড নিয়ে চাল তুলে নিয়ে যাচ্ছে। চেয়ারম্যান-মেম্বাররা ছাড়া এসব কার্ড আর কে দেবে? গরিব মানুষের জন্য একটা সঠিক ব্যবস্থা হওয়া দরকার।

চাল নিতে আসা আকলিমা (৫০) নামে এক নারী জানান, তার নাম মাস্টাররোলে নেই। তার জামাতা তাকে কার্ড দিয়েছেন। অন্য একজনের নামের পাশে কেন টিপসই দিয়েছেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ওরা মারতে বলছে, তাই মারছি।

একই ধরনের তথ্য দেন সন্ধ্যা রানী, মজিদ ও হাবিল হোসেন। তারা জানান, চেয়ারম্যান-মেম্বারদের দেওয়া কার্ড নিয়েই তারা চাল তুলতে এসেছেন। তবে তালিকায় নাম আছে কি না কিংবা কেন অন্যের নামে টিপসই দেওয়া হচ্ছে—সে বিষয়ে তারা কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকারভোগীদের ভুয়া তালিকা তৈরি করে বছরের পর বছর ধরে চেয়ারম্যান ও সদস্যরা নিজেদের পছন্দের লোকদের মাঝে চালের কার্ড বিতরণ করছেন। ফলে প্রকৃত দরিদ্ররা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, সরকারি তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদের দিয়েও চাল উত্তোলন করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যদের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও যোগসাজশেই এই জালিয়াতির চক্র পরিচালিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) আমিনুল ইসলাম বলেন,আমরা যাদের ভোটার আইডি কার্ড নিয়েছি, তাদের কার্ড দিয়েছি। আমার ওয়ার্ডে প্রায় ২০০ জন গরিব মানুষ আছে। পর্যায়ক্রমে তাদের কার্ড দেওয়া হয়।

ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আহসানুল মাহমুদ বলেন,ঈদ উপলক্ষে এবার নতুন মাস্টাররোল তৈরি করা হয়েছে। আমরা সরাসরি কোনো কার্ড বিতরণ করিনি। চেয়ারম্যান ও মেম্বাররাই কার্ড বিতরণ করেছেন। কার্ড নিয়ে যারা চাল নিচ্ছেন, তালিকায় তাদের নাম আছে কি না, সেটা চেয়ারম্যান-মেম্বাররাই ভালো বলতে পারবেন।

বদলগাছী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে আধাইপুর ইউনিয়নের ২ হাজার ১৮৭টি পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে মোট ২১ দশমিক ৮৭ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মাস্টাররোলের বাইরে অন্য ব্যক্তিরা কীভাবে চাল পাচ্ছেন এবং কেন কম ওজনে চাল বিতরণ করা হচ্ছে—এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার এস এম মাজহারুল আলম বলেন,ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে ৯ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। তালিকায় নাম না থাকা কেউ চাল পাচ্ছে কি না, তা আমার জানা নেই। চেয়ারম্যান-মেম্বাররা বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন। যার কাছে কার্ড বা টোকেন আছে, তাকেই চাল দেওয়া হচ্ছে।

বদলগাছী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আশরাফুল নয়ন বলেন,আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আগেও ভিজিএফ চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। তখন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং চেয়ারম্যান ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছিলেন। এরপরও বারবার একই অভিযোগ উঠছে। তাই পুনরায় তদন্ত কমিটি গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে জানতে আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম রেজাউল কবির পল্টনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই তিনি ফোন কেটে দেন।

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইশরাত জাহান ছনি বলেন,বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজন হলে তদন্ত কমিটি গঠন করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


এসআইএল/বিবিএন