রাজশাহীতে এসির পাইপ চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনক ভাবে বাড়লেও নীরব প্রশাসন

AC pipe theft incident
আবুল কালাম আজাদ ০৯ জুন ২০২৬ ০২:২৩ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ ০৯ জুন ২০২৬ ০২:২৩ অপরাহ্ন
রাজশাহীতে এসির পাইপ চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনক ভাবে বাড়লেও  নীরব প্রশাসন
রাজশাহী মহানগরীতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) মূল্যবান তামার তার ও পাইপ চুরির হিড়িক পড়েছে।

রাজশাহী মহানগরীতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) মূল্যবান তামার তার ও পাইপ চুরির হিড়িক পড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই নগরীর আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এমনকি ধর্মীয় উপসনালয় মোসজিদ ও গীর্জা থেকেও চুরি হয়ে যাচ্ছে এসির আউটডোরের পাইপ। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি সম্প্রতি ঈদুল আজহার ছুটিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার সুযোগে একাধিক বড় সরকারি দপ্তরেও হানা দিয়েছে এই চোর চক্র।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো সাধারণ ছিঁচকে চোরের কাজ নয়; বরং প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে পাড়ায় পাড়ায় সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ চক্র। সরকারি ও বেসরকারি সম্পদ চুরির এই মহোৎসবে জনমনে চরম ক্ষোভ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন দেখা দিলেও দৃশ্যত কোনো চোর বা চক্রের সদস্যকে এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত ঈদের সরকারি ছুটি চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) বিভিন্ন হল থেকেই সবচেয়ে বেশি ৯৮টি এসির পাইপ চুরি,রাজশাহী রেলভবন থেকে ১০ এসির পাইপ,  রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের ১১টি, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) ৯টি, রামেক ক্যাম্পাস মসজিদের ৫টি এবং মাদ্রাসা মসজিদের ৩টি এসির পাইপ, উপশহরের ৫ টি মোসজিদের ১২ এসির পাইপ কেটে নিয়ে গেছে চোরেরা। ছুটির সুযোগে আরও বেশ কিছু সরকারি দপ্তরেও একই ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

চুরির এই উপদ্রবে মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ নাগরিকরা। এসি মেরামত কাজের সাথে জড়িত টেকনিশিয়ানরা জানান, এ বছর তামার পাইপ চুরির ঘটনা অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এক বাসায় মেরামত করে আসার পরদিনই আবার চুরির ঘটনা ঘটছে।

শিরোইল মোল্লামিলের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান,ঈদুল আযহার পরে তার বাসার ৪ টি এসির তামার পাইপ রাতের আধারে কেটে নিয়ে যায় চোরেরা।এ বিষয়ে বোয়ালিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ ও মোবাইল ফোনে সরাসরি ওসিকে বিষয়টি সরাসরি জানালেও সমাধান দূরে থাকে, পুলিশ অদ্যাবধি ঘটনা স্থলে আসেনি।একই অভিযোগ শিরোইল এলাকার একাধিক ভুক্তভোগীদের।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, চোরেরা পাইপ কেটে ভেতরের তামা বের করে ভাঙারির দোকানে বড়জোর এক থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারে। অথচ ওই এসিটিকে পুনরায় সচল করতে একজন মালিকের পকেট থেকে খসে যাচ্ছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।

ভুক্তভোগীদের হিসাব অনুযায়ী- নতুন ৩ হাজার টাকার তামার পাইপ, ২,৭০০ টাকার গ্যাস রিফিল, ১,৫০০ টাকার আনুষঙ্গিক মালামাল এবং ২,০০০ টাকা মিস্ত্রি খরচসহ প্রতিবার এসি সচল করতে বিপুল অঙ্কের টাকা দণ্ড দিতে হচ্ছে।

নগরীর মালদা কলোনীর বাসিন্দা আব্দুল খালেক নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, গভীর রাতে দোতলা বাড়ির ছাদে থাকা এসির তামার পাইপ কেটে নিয়ে যায় চোরেরা। প্রচণ্ড গরমে হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু এসি চলছে না। সকালে ছাদে গিয়ে চুরির বিষয়টি বুঝি। শুধু আমার নয়, প্রতিবেশীর আরও ৪-৫টি বাড়িতে একই রাতে এই ঘটনা ঘটেছে। একই ক্ষোভ প্রকাশ করেন মথুরডাঙা এলাকার ব্যবসায়ী মধু রহমান। তাঁর ভাড়া বাসা থেকেও একইভাবে এসির পাইপ চুরি হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, গত চার মাসে রাজশাহী শহরের শতাধিক বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান এই চক্রের শিকারে পরিণত হয়েছে।

এদিকে, চুরির নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই চোরাই সিন্ডিকেটের সাথে শহরের কিছু অসাধু ভাঙারি ব্যবসায়ী সরাসরি জড়িত। মূলত মাদকাসক্ত যুবকেরা রাতের আঁধারে এই ঝুঁকিপূর্ণ চুরির কাজটি করলেও, চোরাই মালগুলো নগরীর কয়েকটি নির্দিষ্ট ভাঙারি দোকানে গোপনে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করা হয়। অতি কম দামে মূল্যবান তামা পেয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা তা গলিয়ে বা লুকিয়ে অন্যত্র পাচার করে দেয়। ফলে চোরদের পেছনে এই অসাধু চক্রের ব্যাকআপ থাকায় চুরির প্রকোপ থামানো যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলাম বলেন, এসির তামার পাইপ চুরির ঘটনার বিষয়ে প্রায়ই আমাদের কাছে অভিযোগ আসে। তবে লিখিত অভিযোগের চেয়ে ভুক্তভোগীদের মৌখিক অভিযোগই বেশি। আমরা যেখানেই খবর বা অভিযোগ পাচ্ছি, সেখানেই চোর চক্রকে শনাক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন,বিষটি খুবই দুঃজনক।তবে ভুক্তভোগীরা থানায় লিখিত অভিযোগে না দেয়ায় সংশ্লীষ্ট থানা পুলিশ ব্যবস্থানিতে পারছেনা। 

 তিনি আরো বলেন, চোরেরা চুরির পাশাপাশি দিনে অন্য পেশায় জড়িত, পুলিশ তো সুনিদৃস্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেন।সুনিদৃস্ট অভিযোগ পেলে আমরা তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নিবো।

তবে ভুক্তভোগী ও নগরবাসীরা বোলছেন, সংশ্লীষ্ট থানা পুলিশ এই চোরদের চিনেন ও জানেন।কোন এলাকায় বা পাড়ায় কে মাদক ব্যবসায়ী,কে চোর বা ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত পুলিশ তা ভালো করেই চিনেন।তাদের থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সনাক্ত করা যাবে চোরদের।

এটি রোধ কোরতে পুলিশের সদিচ্ছায় যথেষ্ট। 

তবে গভীর রাতে টহল পুলিশের চোখ এড়িয়ে এই চুরিগুলো সাধারণত গভীর রাতে ও ভবনের ছাদে বা আড়ালে সংঘটিত হওয়ায় অনেক সময় টহল পুলিশের পক্ষে তাৎক্ষণিক টের পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে শুধু এসি পাইপ চুরিই নয়, নগরীর যেকোনো অপরাধ দমনে এবং এই চক্রটিকে ধরতে পুলিশী তৎপরতা জোরদার রয়েছে বলে জানান, আরএমপি মিডিয়া মুখপাত গাজিউর রহমান।