রেলের টিকিটিংয়ে প্রযুক্তির নামে ভয়ংকর ফাঁদ॥ বিদেশে পাচার ৩ কোটি এনআইডি, নেপথ্যে ব্যাকডোর সিন্ডিকেট
অনলাইনে ট্রেনের স্বস্তিদায়ক টিকিটের অপেক্ষায় থাকেন দেশের কোটি মানুষ। কিন্তু সেবার মোড়কে এই ই-টিকিটিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এখন রূপ নিয়েছে এক সিন্ডিকেটের অনিয়ম ও চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
সরকারি পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের এক আইটি অডিট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকিটিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘সহজ ডটকম’-এর ভয়ংকর সব অপকর্মের চিত্র। এতে কেবল টিকিটের কৃত্রিম সংকট ও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকিই নয়, চরম ঝুঁকিতে পড়েছে জাতীয় নিরাপত্তাও। কোনো প্রকার প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই দেশের প্রায় তিন কোটি নাগরিকের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ও দেশের সামরিক-গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ইতিহাস বিদেশে পাচার করার তথ্য মিলেছে এ অডিটে।
‘বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্টিগ্রেটেড টিকিটিং সিস্টেম (বিআরআইটিএস)’-এর ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর পরিচালিত অডিট প্রতিবেদনে লিড পার্টনার 'সহজ লিমিটেড'-এর চুক্তি বাতিলসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে। চলতি বছরের ১৬ আগস্ট অডিট প্রতিবেদনটি সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে জমা দেওয়া হয়।
অ্যামাজনের বিদেশে ডেটা স্থানান্তর:-
আইটি অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেল ভবনের নিজস্ব ডেটা সেন্টারে তথ্য সংরক্ষণের কথা থাকলেও দেশের ২ কোটি ৮৯ লাখ সেবাগ্রহীতার সংবেদনশীল তথ্য রাখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (AWS) সিঙ্গাপুর অঞ্চলের ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউডে।
ঝুঁকিতে এনআইডি ও সামরিক তথ্য: সংরক্ষিত তথ্যের মধ্যে রয়েছে সাধারণ নাগরিক, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের নাম, এনআইডি/জন্মনিবন্ধন নম্বর, ই-মেইল এবং ভ্রমণ ও আর্থিক লেনদেনের সংবেদনশীল তথ্য।
আইনি ও নিরাপত্তার ঝুঁকি: জাতীয় তথ্য বিদেশে রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের আইনি এখতিয়ার ও জটিলতার কারণে এই ডেটার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
নির্বাচন কমিশনের এপিআই অরক্ষিত: রেলওয়ের রেজিস্ট্রেশন ভ্যালিডেশনের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এনআইডি এপিআই (API) ইন্টারলিংক টেকসফট লিমিটেড নামের তৃতীয় এক ভেন্ডরের মাধ্যমে অরক্ষিত অবস্থায় ইন্টারলিংক করা হয়েছে, যা বড় ধরনের সাইবার অপরাধের পথ খুলে দিয়েছে।
‘অরেঞ্জ ট্রিপস’ কৌশল: উন্মুক্তের আগেই টিকিট ব্লক
যাত্রীরা সাধারণ সময়ে অনলাইনে প্রবেশ করে মিনিটেই 'টিকিট শেষ' দেখতে পাওয়ার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে প্রতিবেদনে। সিস্টেমের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ড্যাশবোর্ড অপব্যবহার করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
অডিটে দেখা যায়, সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট উন্মুক্ত করার ১ থেকে ৫ দিন আগেই (যাত্রার তারিখ থেকে ১১-১৫ দিন আগে) ড্যাশবোর্ডের ‘ট্রিপ’ মেনুর ‘অরেঞ্জ ট্রিপস’ সাবমেনু থেকে ব্যাকডোরে টিকিট ব্লক করা হয়। পরবর্তীতে স্টেশনে নিয়োজিত সহজের প্রতিনিধি ও রেলের বুকিং সহকারীদের যোগসাজশে তা কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।
লাইভ সার্ভারে অবৈধ দখল ও বিশাল রাজস্ব ঘাটতি:-
২০২২ সালের মার্চে ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি’র সঙ্গে ৫ বছরের চুক্তি করে রেলওয়ে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মূল টিকিট অপারেশন ও লাইভ সার্ভারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে রেলওয়ের নিজস্ব কর্মীদের হাতে; ভেন্ডর (সহজ) শুধু সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ করবে এবং টিকিটপ্রতি ২০ পয়সা পাবে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ১৬৩টি স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি সহজের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে। চুক্তির ১৮ মাস পূর্তিতে (১৮ আগস্ট ২০২৩) নির্দেশিত ১০টি শর্তের মধ্যে ৫টি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও রেলওয়ে তা আরোপ করেনি। উল্টো অনলাইন বিক্রয়ের বিপরীতে ভ্যাট কম জমা দেওয়া এবং প্রকৃত আয় লুকানোর মাধ্যমে ৮ কোটি ৩৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সরকারি রাজস্ব ক্ষতি করা হয়েছে।
কাগজে ‘জেভি’, বাস্তবে অদৃশ্য অংশীদার ও নেতৃত্বহীন প্রতিষ্ঠান:-
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুক্তির পরপরই দরপত্রের তিন অংশীদারের সম্পর্কে ফাটল ধরে।
সিনেসিস আইটি: প্রতিষ্ঠানটির চিফ সল্যুশন অফিসার মো. আমিনুল বারি শুভ জানান, “রেলের ই-টিকিটিং বা প্রযুক্তিগত মূল অপারেশনের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা নেই। এসব কার্যক্রম সহজ ডটকমের।
ভিনসেন জেভি: ওয়েস্টার্ন গ্রুপের সহযোগী এই প্রতিষ্ঠানটিকে অডিটে কাগুজে হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রুপের কনসালট্যান্ট মেহেদি হাসান স্বীকার করেন, “আমরা শুধু অর্থ বিনিয়োগ করেছিলাম, কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। তবে কাগজে নাম থাকায় আমরা দায় এড়াতে পারি না।
সহজ ডটকম: প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মালিহা এম কাদির সম্প্রতি সব স্বত্ব ছেড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন। যোগাযোগ করা হলে অডিট সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সিইও কর্নেল (অব.) আমিনুল হক বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং সাক্ষাৎকার দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
রেল কর্তৃপক্ষের নির্বিকার ভূমিকা:-
রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন অভিযোগের বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছেন। তবে রেলওয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রূপম আনোয়ার জানান, অডিট প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
রেল ও সড়ক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে অবহিত ছিলেন না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, কোটি কোটি এনআইডি ডেটা বিদেশে সংরক্ষিত থাকার তথ্য অত্যন্ত গুরুতর এবং এটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।