মহাসড়কে আতঙ্কের অন্য নাম বালুবাহী ডাম্প ট্রাক: বেপরোয়া গতি ও ধূলাবালিতে বিপর্যস্ত জনজীবন

Another name for terror on the highway is sand-laden dump trucks
আবুল কালাম আজাদ, ​বিশেষ প্রতিনিধি:- ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, ​বিশেষ প্রতিনিধি:- ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন
মহাসড়কে আতঙ্কের অন্য নাম বালুবাহী ডাম্প ট্রাক: বেপরোয়া গতি ও ধূলাবালিতে বিপর্যস্ত জনজীবন
ছবি - বিজয় বাংলা

রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক ও এর সংযুক্ত আঞ্চলিক সড়কগুলোতে বেপরোয়া গতিতে চলাচলকারী বালু ও মাটিবোঝাই ডাম্প ট্রাক এখন চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের হাতে এসব ভারী যানবাহনের স্টিয়ারিং থাকলেও ট্রাফিক বিভাগের কার্যকর নজরদারির অভাব স্পষ্ট। অন্যদিকে, পদ্মা নদী থেকে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে বালু তোলায় হুমকির মুখে পড়েছে নদী তীররক্ষা বাঁধও।

সরজমিন গিয়ে ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে ​ জানা গেছে, রাজশাহী ও গোদাগাড়ীর পদ্মার বিভিন্ন বালুঘাট থেকে দিনরাত বালু ও মাটির অবৈধ কারবার চালাচ্ছে প্রভাবশালী চক্র। প্রতিটি ট্রাকে ৩০ থেকে ৪০ টন পর্যন্ত বালু ও মাটি বহন করা হচ্ছে, যেখানে সড়কগুলোর সর্বোচ্চ ভারবহন ক্ষমতা ১৫ থেকে ২০ টন। অতিরিক্ত পণ্য বহনের ফলে কয়েকশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাজশাহী- চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক এবং বিজয়নগর-উজানপাড়ার ভেতরের পিচঢালা সড়কগুলো এমনকি রাজশাহী মহানগরীর রাস্তা গুলো  দ্রুত ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

​সরেজমিনে দেখা যায়, গোদাগাড়ী উপজেলার সেখেড়পাড়া, ভাটোপাড়া, ফুলতলা, সারেংপুর ও সুলতানগঞ্জ গাংবাড়ী পয়েন্টে নদী থেকে বালু তুলে ডাম্প ট্রাক, সাধারণ ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। বালু বহনের সময় নামমাত্র ত্রিপল বা পর্দা ব্যবহার করায় অনবরত বালু উড়ে এসে পথচারী, শিক্ষার্থী ও মোটরসাইকেল চালকদের চোখে-মুখে পড়ছে।

ট্রাকে বালু  ঢাকা না থাকায় সড়কে বালু ও কাদা ছিটিয়ে পিচ্ছিল হয়ে ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। একই সঙ্গে অতিরিক্ত হর্ন, ধূলাবালি ও কালো ধোঁয়ায় বাতাসে ছড়াচ্ছে মারাত্মক দূষণ, ফলে আশপাশের বাসিন্দারা আক্রান্ত হচ্ছেন শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগে।


​স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক বিভাগের তদারকির অভাব ও রহস্যজনক প্রশাসনিক নীরবতার সুযোগে বালু মাফিয়ারা দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ভাটোপাড়ার বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, "ধূলার কারণে ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রাখতে হয়, বাইরে কাপড় শুকানো যায় না। সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে আমরা সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তায় থাকি।

রাজশাহী সিভিল সার্জেন ডাঃ এস,আই,এম রাজিউল করিম বলেন,ধুলাবালু বা বালুঝড়ের কারণে মূলত শ্বাসতন্ত্র, চোখ, ত্বক এবং হৃদযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। 

এছাড়া অতিরিক্ত ধুলাবালুর সংস্পর্শে এলে শ্বাসনালীতে প্রদাহ তৈরি হয়ে হাঁপানি (অ্যাজমা), ব্রঙ্কাইটিস, দীর্ঘস্থায়ী সর্দি-কাশি এবং তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। পাশাপাশি, চোখের কর্নিয়ায় বালুর কণার আঁচড় লেগে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে এবং চোখ লাল হওয়া বা কনজাংটিভাইটিসের মতো ইনফেকশন ঘটতে পারে। এছাড়া, এটি ত্বকের আর্দ্রতা নষ্ট করে অ্যালার্জি, র‌্যাশ ও একজিমার মতো চর্মরোগ সৃষ্টি করে এবং বাতাসে থাকা অতি সূক্ষ্ম বালুকণা রক্তের সাথে মিশে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই ক্ষতিগুলো থেকে বাঁচতে নাখে রুমাল বা কাপড়, চোখে চশমা ব্যবহার,রাস্তার ধারের দোকানপাট থেকে খোলাখাবার বা খাদ্য পণ্য না খাওয়া ও না কেনার পরামর্শ দেন তিনি।

​বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) রাজশাহী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কটিতে বেপরোয়া বালুর ট্রাক চলাচলের কারণে বছরে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনই এসব সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ, যা তদারকির দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের।

​সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, "অপ্রচলিত ও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলায় সড়ক অবকাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। মহাসড়ক সংলগ্ন ইটভাটাগুলোতেও খোলা ট্রাকে মাটি ও বালু নেওয়ায় সড়ক পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। শিগগিরই এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন (ওজন স্কেল) স্থাপনের কাজ শেষ হলে অতিরিক্ত পণ্য বহন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

​সার্বিক বিষয়ে গোদাগাড়ী অঞ্চলের ট্রাফিক সার্জেন্ট আমির হামজা জানান, বেপরোয়া গতি কিংবা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে। খোলা অবস্থায় বালু পরিবহন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, চালক ও মালিকদের সতর্ক করার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।