রাজশাহীতে আবাসিক মিটারে অটোরিকশার চার্জিং বাণিজ্য: রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি

Autorickshaw charging business on residential meters
আবুল কালাম আজাদ ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫০ পূর্বাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫০ পূর্বাহ্ন
রাজশাহীতে আবাসিক মিটারে অটোরিকশার চার্জিং বাণিজ্য: রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি
রাজশাহী মহানগরীতে অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

রাজশাহী মহানগরীতে অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এর সাথে পাল্লা দিয়ে নগরজুড়ে গড়ে উঠেছে ছোট-বড়  প্রায় হাজারের অধিক গ্যারেজ ও অনানুষ্ঠানিক চার্জিং পয়েন্ট। 

এসব পয়েন্টের একটি বড় অংশে বাণিজ্যিক সংযোগের বদলে আবাসিক মিটার ব্যবহার করে অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ চুরির উদ্দেশ্যে মেইন লাইন থেকে নেওয়া হচ্ছে অবৈধ হুকিং ও বাইপাস সংযোগ।

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চালানো এ অসাধু বাণিজ্যে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে; পাশাপাশি মূল পাওয়ার গ্রিডে তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত লোড, যা বাড়াচ্ছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

​নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো) নিয়মানুযায়ী আবাসিক ও বাণিজ্যিক সংযোগের বিদ্যুৎ মাশুলে রয়েছে বড় ব্যবধান। অথচ নগরীর অলিগলিতে বাসাবাড়ি ও দোকানপাটের স্বল্পমূল্যের সংযোগ ব্যবহার করে রাতভর চলছে ইজিবাইক ও চার্জার রিকশার ব্যাটারি চার্জিং। 

জানাগেছে, প্রতিটি অটোরিকশা থেকে দৈনিক ১৮০ থেকে ২০০ টাকা আদায় করা হলেও সে অনুপাতে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছেন না গ্যারেজ মালিকরা।

​রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) তথ্যমতে, নগরীতে নিবন্ধিত বড় অটোরিকশা রয়েছে ৮ হাজার ৯৭০টি এবং ছোট অটোরিকশা (চার্জার) রয়েছে ৫ হাজার ৮১৯টি।অর্থাৎ বৈধ যানবাহনের মোট সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৮৯টি। 

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিদিন মহানগরীতে চলাচল করছে প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা। এদের চার্জ দিতে নগরীতে গড়ে উঠেছে প্রায় সাড়ে ৭০০টি গ্যারেজ। অধিকাংশ গ্যারেজই সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক এবং সেখানে নেই কোনো প্রাথমিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা।

​প্রকৌশলীদের তথ্যমতে, একটি ইজিবাইকে ১২ ভোল্টের ৪ থেকে ৬টি ব্যাটারি থাকে, যা সম্পূর্ণ চার্জ হতে সময় নেয় ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা। এতে গড়ে ৬ থেকে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। 

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম সরকার বলেন, "একটি ব্যাটারিরিকশা চার্জ নিতে ১০ ইউনিটেরও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। রাতভর একসাথে শত শত অটোরিকশা অবৈধ বা অপ্রতুল সংযোগে চার্জে দেওয়ায় মূল গ্রিডে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। এটি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি।

​এদিকে গ্যারেজগুলোর সঠিক পরিসংখ্যান নেই খোদ রাসিকের কাছেই। সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ-সাইদ বলেন, "নগরীতে মোট কতটি গ্যারেজ আছে তার সঠিক হিসাব নেই। তবে মাঝে মাঝে তদারকি করা হয়। অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

​বিদ্যুৎ অপচয় ও চুরির বিষয়ে নেসকো-র প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) জিয়াউল ইসলাম জানান, "আবাসিক মিটারে বাণিজ্যিক চার্জিং এবং অবৈধ হুকিংয়ের বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। বিদ্যুৎ চুরি রুখতে প্রতিনিয়ত মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আবাসিক সংযোগ অপব্যবহারের প্রমাণ মিললে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

​নগরীর জিরোপয়েন্ট, রেলগেট, তালাইমারী ও ভদ্রাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে রাসিক ও আরএমপি যৌথভাবে জিপিএস ও কিউআর কোড যুক্ত ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন চালুর উদ্যোগ নিলেও চার্জিং পয়েন্টগুলোর সুনির্দিষ্ট তদারকি এখনো অধরা।

 সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করলেই এ সংকটের নিরসন হবে না; দ্রুততম সময়ে চার্জিং অবকাঠামোকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও বাণিজ্যিক নীতিমালার আওতায় আনা জরুরি।