দুর্বল হাত-ঝাপসা দৃষ্টি, আপনার শরীর কি ‘ফোন বডি’র শিকার?
মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন আনছে, যা আমরা অনেক সময় টেরই পাই না। প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত মানসিক স্বাস্থ্যের কথাই বেশি উঠে আসে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাব শরীরেও স্পষ্টভাবে পড়ছে।
ঘাড়ের গঠন বদলে যাওয়া, চোখের দৃষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, হাতের পেশির শক্তি কমে যাওয়া, সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতা হ্রাস পাওয়া, এমনকি ত্বকে বলিরেখা পড়ার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ভূমিকা থাকতে পারে।
এর কিছু শারীরিক পরিবর্তন ভবিষ্যতে বোধশক্তির হ্রাস বা আরও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকরা।
ঘরের ভেতর বেশি সময়, ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টি
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে মায়োপিয়া (নিকটদৃষ্টি সমস্যা) দ্রুত বেড়েছে।
অনেকেই এর জন্য সরাসরি মোবাইল ফোনকে দায়ী করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির অপটোমেট্রির অধ্যাপক ডোনাল্ড মুত্তি বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, ফোনের মতো কাছ থেকে কিছু দেখার অভ্যাসই মূল কারণ নয়।
বরং শিশুদের ক্ষেত্রে বাইরে খোলা পরিবেশে কম সময় কাটানোই বড় কারণ। সূর্যের উজ্জ্বল আলো চোখের রেটিনা থেকে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা চোখের স্বাভাবিক বিকাশে সহায়ক বলে ধারণা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রতিদিন কিছু সময় বাইরে কাটান। এতে শুধু চোখই নয়, ঘুমের মানও উন্নত হতে পারে। তবে বাইরে থাকলে অবশ্যই সানস্ক্রিন ও সানগ্লাস ব্যবহার করতে হবে।
‘টেক নেক’: ঘাড়ে ২৭ কেজি পর্যন্ত চাপ
মোবাইল ব্যবহারের সময় অধিকাংশ মানুষই মাথা নিচু করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই ভঙ্গিকে বলা হয় ফরওয়ার্ড হেড পোস্টার বা জনপ্রিয় ভাষায় ‘টেক নেক’।
এভাবে মাথা নিচু করলে ঘাড়ের ওপর প্রায় ৬০ পাউন্ড (প্রায় ২৭ কেজি) পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে মেরুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, জয়েন্ট ও পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে, এমনকি ফুসফুসের কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের গঠনও স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে।
সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা ফোন চোখের সমান উচ্চতায় ধরে ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। কম্পিউটার মনিটরও একই উচ্চতায় রাখা উচিত। পাশাপাশি নিয়মিত বিরতি নেওয়াও জরুরি। প্রতি ৩০ মিনিট পর অন্তত ২০ মিনিটের বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ।
ঘাড়ে বলিরেখা, ত্বকে জ্বালা
যুক্তরাজ্যের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ জাস্টিন হেক্সটল বলেন, বারবার ঘাড় ভাঁজ হওয়ার কারণে বলিরেখা পড়তে পারে, এমন ধারণা যুক্তিযুক্ত হলেও এখনো তা প্রমাণ করার মতো শক্ত গবেষণা নেই।
তবে স্মার্টওয়াচ দীর্ঘ সময় খুলে না রাখলে অন্য সমস্যা হতে পারে। ঘড়ির নিচে আর্দ্র ও অন্ধকার পরিবেশে ছত্রাক জন্মাতে পারে, যার ফলে ত্বকে জ্বালা, একজিমা বা অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। নিকেল, রাবার, ল্যাটেক্স বা অ্যাক্রিলেট জাতীয় উপাদানের প্রতিও সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে।
সমাধান হিসেবে স্মার্টওয়াচ নিয়মিত খুলে ত্বক পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজনে ব্যারিয়ার ক্রিম ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কমছে হাতের শক্তি
হাতের আকঁড়ে ধরার শক্তিকে (গ্রিপ স্ট্রেন্থ) বর্তমানে সার্বিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিপ স্ট্রেন্থ রক্তচাপের চেয়েও ভালোভাবে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
জার্মানির লাউজিৎস মেডিকেল ইউনিভার্সিটির মেডিকেল সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইয়োহানেস বেলার বলেন, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হাতের শক্তি কমে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক।
তার মতে, কম্পিউটারনির্ভর বসে থাকার জীবনধারা শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যার প্রভাব হাতের শক্তিতেও পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, একটি টেনিস বল শক্ত করে চেপে অন্তত ১৫-৩০ সেকেন্ড ধরে রাখতে পারা উচিত। না পারলে কবজির ব্যায়ামসহ নিয়মিত শরীরচর্চা প্রয়োজন।
হাত-চোখের সমন্বয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
জার্মানির রেগেন্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশমনোবিজ্ঞান ও শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান সুগাতে বলেন, প্রযুক্তি হয়তো ক্লিক বা সোয়াইপ করার মতো নির্দিষ্ট দক্ষতা বাড়ায়, কিন্তু সামগ্রিক সূক্ষ্ম মোটর স্কিলের (শরীর ও পেশির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বয় করার সক্ষমতা) ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবের প্রমাণ বাড়ছে।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে মোটর দক্ষতা হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। আর মোটর দক্ষতা কমে গেলে তা বোধশক্তি ও শিক্ষাগত বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে তিনি আতঙ্কিত হওয়ার পরামর্শ দেন না। বরং প্রতিদিন হাতে-কলমে কিছু কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন। যেমন রান্না করা, ছবি আঁকা, কাঠের কাজ, বাদ্যযন্ত্র শেখা কিংবা হাতে লিখে চর্চা করা; এসব কার্যক্রম হাত ও মস্তিষ্কের সমন্বয় বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
সুগাতের ভাষায়, ‘এগুলো পৃথিবীর শেষ নয়। ব্যক্তিগতভাবে প্রভাব হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর প্রভাব জমতে থাকলে বাস্তব জগতকে উপলব্ধি ও বোঝার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। কারণ আমাদের হাতই পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।’
তথ্যসূত্র: বিবিসি