কমলা ঠোঁটের রহস্যময় বানর, নতুন প্রজাতি শনাক্ত

Mysterious orange-lipped monkey, new species identified
অনলাইন ডেস্ক ১৯ জুলাই ২০২৬ ০৯:২৭ অপরাহ্ন ফিচার
অনলাইন ডেস্ক ১৯ জুলাই ২০২৬ ০৯:২৭ অপরাহ্ন
কমলা ঠোঁটের রহস্যময় বানর, নতুন প্রজাতি শনাক্ত
--সংগৃহীত ছবি

‘কলোবাস কঙ্গোয়েনসিস’ নামে পরিচিত এ বানরকে স্থানীয়রা ‘লিকওয়েলি’ নামে চেনে।

আফ্রিকা মহাদেশের গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে কমলা রঙের ঠোঁট ও গম্ভীর স্বরে ডাকা একটি নতুন প্রজাতির বানরের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

‘কলোবাস কঙ্গোয়েনসিস’ (Colobus congoensis) নামে পরিচিত এ বানরকে স্থানীয়রা ‘লিকওয়েলি’ নামে চেনে।

বিজ্ঞান সাময়িকী পিএলওএস ওয়ান-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ৭৫ বছরে আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া এটি মাত্র পঞ্চম নতুন বানর প্রজাতি।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটি (এফএইউ) এবং সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক (সিইউএনওয়াই) গ্র্যাজুয়েট সেন্টারের গবেষকরা।

গবেষকদের মতে, নতুন এই বানরের দেহ চকচকে কালো লোমে আবৃত, রয়েছে লম্বা লেজ ও ঘন পশম। মুখে কমলা-ক্রিম রঙের দাগ এবং কমলা ঠোঁট একে অন্য সব কলোবাস বানর থেকে সহজেই আলাদা করে।

এছাড়া এর মাথার খুলি, দাঁত ও কঙ্কালের গঠনও আফ্রিকার অন্য সব পরিচিত কলোবাস বানরের তুলনায় ভিন্ন।

এটি একই গোত্রের অন্য বানরদের তুলনায় আকারেও ছোট।

পূর্ণবয়স্ক একটি লিকওয়েলির ওজন প্রায় ৬ দশমিক ৮ কেজি।

এফএইউ জানায়, মসৃণ ও আলো প্রতিফলিত করা লোম, মুখের চারপাশে লম্বা কালো পশম এবং বড় ভাঁজযুক্ত কান এ প্রজাতিকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক এবং এফএইউর চার্লস ই. শ্মিট কলেজ অব সায়েন্সের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কেট ডেটউইলার বলেন, ‘কলোবাস কঙ্গোয়েনসিসের আবিষ্কার আফ্রিকার বানরের বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে নতুনভাবে গড়ে দিচ্ছে।’

তিনি জানান, এ প্রজাতির সবচেয়ে কাছের পরিচিত আত্মীয় ‘কলোবাস স্যাটানাস’, যার আবাস পশ্চিম-মধ্য আফ্রিকায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরে। তবে জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুই প্রজাতির বিচ্ছেদ ঘটেছিল প্রায় ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন বছর আগে, যা কলোবাস গোত্রের অন্যতম প্রাচীন বিবর্তনীয় বিভাজন।

নতুন প্রজাতিটি শনাক্তের কাজ শুরু হয় ২০০৮ সালে, যখন পূর্ব-মধ্য ডিআর কঙ্গোতে গবেষকরা প্রথম একটি অস্বাভাবিক বানরের ছবি তোলেন। দশ বছর পর তারা আরও স্পষ্টভাবে প্রাণীটিকে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হন। এরপর ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এ প্রজাতিকে ১১৪ বার দেখা যায়।

শুধু বাহ্যিক গঠন নয়, গবেষকরা প্রাণীটির জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেন এবং স্থানীয় জনগণের পরিবেশগত জ্ঞানও কাজে লাগান, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি আগে কখনো বর্ণনা করা হয়নি।

সিইউএনওয়াই গ্র্যাজুয়েট সেন্টার ও হান্টার কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার গিলবার্ট বলেন, নতুন কোনো প্রজাতি শনাক্ত করতে হলে প্রমাণ হতে হয় অত্যন্ত শক্তিশালী।

তিনি বলেন, গবেষকরা জাদুঘরে সংরক্ষিত মাথার খুলি, চামড়া ও কঙ্কালসহ পরিচিত আফ্রিকান কলবাস বানরের বিভিন্ন নমুনার সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। সেই বিশ্লেষণই নিশ্চিত করেছে যে কলোবাস কঙ্গোয়েনসিস একটি স্বতন্ত্র প্রজাতি।

তবে নতুন এই বানরের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। কারণ এখন পর্যন্ত এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে মাত্র ১ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে।

গবেষকদের সুপারিশ, সীমিত বিস্তৃতি, বন উজাড় এবং শিকারের চাপের কারণে কলোবাস কঙ্গোয়েনসিসকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা উচিত।

সিইউএনওয়াইর বিবৃতিতে বলা হয়, এ প্রজাতির অধিকাংশ পরিচিত আবাসস্থল লোমামি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অবস্থিত। ফলে বানরটির টিকে থাকার জন্য ওই অঞ্চলের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় অংশ না নেওয়া যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইমেটোলজির জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আলেকজান্ডার জর্জিয়েভ গবেষণাটিকে ‘খুবই বিস্তারিত ও বিশ্বাসযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, এমন একটি নতুন বানর প্রজাতি খুঁজে পাওয়া, যা শুধু বিজ্ঞানীদের কাছেই নয়, বরং যেখানে এটি বাস করে সেই এলাকার অধিকাংশ মানুষের কাছেও প্রায় অজানা। এটি সত্যিই অত্যন্ত বিরল এবং রোমাঞ্চকর ঘটনা।

তার ভাষ্য, গবেষকরা নতুন প্রজাতিটির আবাসসংলগ্ন ৫২টি গ্রামের মধ্যে মাত্র আটটি গ্রামের বাসিন্দাদের কাছ থেকেই এ প্রাণী সম্পর্কে তথ্য পেয়েছেন। এ কারণেই প্রজাতিটি এতদিন বিজ্ঞানীদের নজরের বাইরে ছিল।

তিনি আরও বলেন, কঙ্গোর বিস্তীর্ণ রেইনফরেস্ট অত্যন্ত বড় এবং এর বিশাল অংশ এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে পর্যাপ্তভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি।

তথ্যসূত্র: সিএনএন