এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ছে: বগুড়ায় দেড় বছরে শনাক্ত ৯৩ জন
বগুড়ায় এইচআইভি সংক্রমণের চিত্র উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। গত ১৯ মাসে ২ হাজার ১৬৪ জনের পরীক্ষা করে ৯৩ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। একই সময়ে আটজনের মৃত্যু হয়েছে, যার তিনটি ঘটেছে গত সাত মাসে।
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের এইচটিসি (এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং) সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ মাসে এইচআইভি পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছেন ২ হাজার ১৬৪ জন। তাদের মধ্যে ৯৩ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৮১ জন, নারী ১০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের দুজন। অর্থাৎ শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৮৭ শতাংশই পুরুষ।
এ সময়ে শুধু বগুড়া জেলার ৯২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি গত ১৯ মাসে এইচটিসি সেন্টারে মোট ৫৯৭ জন এইচআইভি রোগী সন্দেহে রেজিস্ট্রেশন করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন করে আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা ও নিয়মিত ফলোআপের আওতায় থাকা রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এইচআইভি সংক্রমণের পেছনে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন সম্পর্কসহ একাধিক কারণ রয়েছে। বিশেষ করে পুরুষে পুরুষে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমণের হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এর পাশাপাশি যৌনকর্মীদের মাধ্যমে সংক্রমণ, অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ এবং ব্যবহৃত সুঁই বা সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকেও এইচআইভি ছড়াতে পারে।
প্রতিদিনই আসছে নতুন রোগী:
শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন এইচআইভি পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে আসেন। পরীক্ষায় পজিটিভ শনাক্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে কাউন্সেলিং করা হয়। তাদের জানানো হয়, এইচআইভি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রেখে দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।
শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, এখানে এইচআইভি পরীক্ষা, কাউন্সেলিং এবং আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। পজিটিভ রোগীদের বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে।
রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে এইচআইভি পজিটিভ রোগীরা চিকিৎসা নিতে শজিমেক হাসপাতালে আসেন। বৃহত্তর রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বগুড়ার শজিমেক হাসপাতাল, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এইচটিসি সেন্টার রয়েছে।
আক্রান্তদের বেশিরভাগই পুরুষ:
হাসপাতালের ১৯ মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত ৯৩ জনের মধ্যে ৮১ জনই পুরুষ। নারী ১০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের দুজন। অর্থাৎ আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের হার প্রায় ৮৭ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্তদের মধ্যে তরুণ ও কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, অরক্ষিত যৌন সম্পর্কসহ বিভিন্ন কারণে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে গিয়ে বিভিন্ন বয়সী কয়েকজনকে এইচআইভি পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে নওগাঁরনওগাঁর সাপাহার উপজেলার নজিরপুর এলাকা থেকে আসা এক দম্পতিও ছিলেন। নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে কথা বলেন তারা।
ওই দম্পতি জানান, সম্প্রতি তারা এইচআইভি পরীক্ষা করিয়েছেন। পরীক্ষার ফলাফলে স্বামী স্ত্রী দুজনের শরীরেই এইচআইভি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্ত্রীর শরীরে ভাইরাসের মাত্রা তুলনামূলক বেশি এবং স্বামীর শরীরে কম।
এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার বিষয়টি জানার পর তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলেও জানান। সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না তারা। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান।
ওই দম্পতি বলেন, এইচআইভি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য না করে তাদের চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
এইচআইভি আক্রান্তদের কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্ব:
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এইচআইভি পজিটিভ ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বলেন, অনেক দিন হলো আমার এইচআইভি পজিটিভ ধরা পড়েছে। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। মাসে দুইবার এখানে পরীক্ষা করাতে আসি।
তিনি বলেন, এইচআইভি বিভিন্নভাবে ছড়ায়। আমারও কোনো না কোনোভাবে সংক্রমিত হয়েছে। পজিটিভ হওয়ার পর নিজেকে অপরাধী মনে হতো। কখনো আত্মহত্যা করার কথাও মনে হয়েছে। আবার কখনো মনে হয়েছে, অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেই। নানা ধরনের খারাপ চিন্তা মাথায় আসত।
ওই ব্যক্তি জানান, পরে এইচটিসি সেন্টারে কাউন্সেলিং নেওয়ার পর তার মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করে বর্তমানে ভালো আছেন তিনি।
শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সেলর আব্দুস সালাম বলেন, এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার পর অনেক রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ আত্মহত্যার কথাও ভাবেন। আবার কেউ কেউ রাগ ও হতাশা থেকে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার চিন্তাও করেন। এ কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা জরুরি।
তিনি বলেন, আমরা রোগীদের নিয়মিত এইচটিসি সেন্টারে আসতে বলি। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাদের মানসিকভাবে শক্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চললে এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।
শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের চিকিৎসক ডা. মো. সুলতান ইবনে সাঈদ বলেন, এইচআইভি সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ যৌন সম্পর্ক। নারী পুরুষের মধ্যে এবং পুরুষে পুরুষে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেও এইচআইভি ছড়াতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে শিশুর শরীরেও সংক্রমণ হতে পারে। গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদানের সময় এবং মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, এইচআইভি প্রতিরোধে প্রতিবার যৌনমিলনের সময় সঠিক নিয়মে কনডম ব্যবহার করতে হবে। একজন যৌনসঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। এইচআইভি পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণ করা যাবে না। একইভাবে অন্যের ব্যবহৃত ইনজেকশনের সুঁই বা সিরিঞ্জ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এইচআইভি আক্রান্ত মায়ের সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং নিতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে মা থেকে শিশুর শরীরে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, এইচআইভি নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে নিয়মিত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।