রাকসু-শিবির নেতার রাবি গ্রন্থাগারে মারধরের ঘটনা নজিরবিহীন

Raksu-Shibir leader beaten up at RU library
আবুল কালাম আজাদ:- ২৯ জুলাই ২০২৬ ০৭:১০ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ:- ২৯ জুলাই ২০২৬ ০৭:১০ অপরাহ্ন
রাকসু-শিবির নেতার রাবি গ্রন্থাগারে মারধরের ঘটনা নজিরবিহীন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করছিলেন রাকসু ও শিবির নেতা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করছিলেন রাকসু ও শিবির নেতা। ওই মুহুর্তে চেয়ার উচিয়ে তেড়ে যান ‘শিবিরপন্থী’ হিসেবে পরিচিত রমজান আলী।  সোমবার(২৮জুলাই) বিকেলে  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধরের সময় রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতার সক্রিয় ও বেপরোয়া ভূমিকার প্রমাণ মিলেছে ভিডিও ফুটেজে। প্রক্টর, শিক্ষক ও পুলিশের উপস্থিতিতে পাঠকক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধরের এ ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ছাত্রসংগঠনের সহিংসতা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীকে মারধরের নজির নেই। ২০১৪ সালে সান্ধ্য কোর্স বাতিলের আন্দোলনে পুলিশ ও ছাত্রলীগের ধাওয়ায় শতাধিক শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারে আশ্রয় নেন। ওই সময় তাঁদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কয়েকজন শিক্ষক। প্রায় চার ঘণ্টা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পর কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বের করে আনা হয়েছিল।

 গত সোমবার এক ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধের জেরে তিন শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে আশ্রয় নেন। সেখানে ঢুকে তাঁদের মারধর করেন রাকসু ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা। পরে আহত এক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়েও মারধর করা হয়।


এমন কর্মকাণ্ডকে ‘মব সন্ত্রাস’ অ্যাখ্যা দিয়ে ঘটনাটির তদন্ত সাপেক্ষে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ও ভেতরে মারধরের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, মারধরে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ শিবিরের কয়েকজন নেতা সরাসরি অংশ নেন। কয়েকটি ভিডিওতে তাঁদের আচরণ ছিল আক্রমণাত্মক।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাতে বেলচা নিয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকতে চাইছেন আম্মার। সহযোগীরা তাঁকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছেন। এ সময় আনাস নামের এক শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ করে আম্মার বলেন, ‘তোরে একবারে পুঁইতা ফেলাব কিন্তু, একবারে পুঁতে ফেলব।’

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, পাঠকক্ষের ভেতরে একটি বড় লাঠি দিয়ে এক শিক্ষার্থীকে পেটাচ্ছেন আম্মার। সেখানে শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।

আরেকটি ভিডিওতে প্রক্টরের উপস্থিতিতেই রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির, শিবিরের মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব, রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব এবং শিবিরপন্থী হিসেবে পরিচিত রমজান আলীকে এক শিক্ষার্থীকে ঘুষি ও চড়-থাপ্পড় মারতে দেখা যায়। একপর্যায়ে রমজান আলী চেয়ার তুলে আঘাত করতে উদ্যত হলে প্রক্টরসহ উপস্থিত ব্যক্তিরা তাঁকে থামান।

গ্রন্থাগারের প্রধান ফটকের সামনে ধারণ করা আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, আহত এক শিক্ষার্থীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়ে লাথি ও মারধর করা হচ্ছে। সেখানে রমজান আলী, শিবিরের ক্যাম্পাস মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর ও সিনেট সদস্য ফজলে রাব্বি ফাহিম, রাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য ইমজিয়াউল হক ও বিজয়-২৪ হল সংসদের ভিপি রাসেল মিয়াকে মারধরে সক্রিয় দেখা যায়। অন্য ভিডিওতে রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর এবং শহীদ হবিবুর রহমান হল সংসদের ভিপি আহসানুল্লাহ ফারহানকেও মারধরে অংশ নিতে দেখা যায়।

শিবির ও আম্মারের বক্তব্য:-

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সংগঠনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, হামলার খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দেখতে পান।

মারধরের বিষয়ে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, তাঁরা প্রক্টরের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে পুলিশের কাছে দেওয়ার দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরে তাঁকে প্রশাসন ভবনের সামনে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর রাকসু ভবনে তাঁদের ওপর হামলা হয়।

আম্মারের ভাষ্য, ‘দুই বছর ধরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসন থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাকসু প্রতিনিধিদের ওপর হামলা করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হবে না—এর নিশ্চয়তা কী? এর দায় কে নেবে? আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলাম, কিন্তু কী হলো! সেই জায়গা থেকে আমরা এখানে এসেছি।’

‘বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির অবমাননা’:-

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্ধিত ফি প্রত্যাহার ও সান্ধ্য কোর্স বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের হামলা ও পুলিশের রাবার বুলেট-কাঁদানে গ্যাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শতাধিক শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আশ্রয় নেন। তখন শিক্ষার্থীদের পক্ষে কয়েকজন শিক্ষক মানবঢাল হয়ে দাঁড়ান। প্রায় চার ঘণ্টা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পর কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের নিরাপদে গ্রন্থাগার থেকে বের করে আনতে সক্ষম হন তাঁরা।

ওই সময় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো শিক্ষকদের একজন অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার  বলেন, তখন শতাধিক শিক্ষার্থীকে নিরাপদে বের করে আনতে শিক্ষকেরা মানবঢাল তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ’২৪-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই মারধরের শিকার হচ্ছেন তাঁরা—এটি অত্যন্ত লজ্জার।

প্রশাসনের উপস্থিতিতে গ্রন্থাগারে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির চরম অবমাননা বলে মন্তব্য করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন। তিনি বলেন, প্রশাসনের উপস্থিতিতে গ্রন্থাগারে ঢুকে এভাবে মারধর করেছে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি দাবিকারী রাকসু ও শিবির। এটি ভীষণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির অবমাননা। এ হামলার চেয়ে জঘন্য ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।