মঙ্গলবার সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রথম বৈঠক
বিরোধী দল যোগ না দেওয়ায় অবশেষে ১২ সদস্য নিয়েই সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির সভাপতি সালাউদ্দিন আহমদ।
সংসদ সচিবালয় জানায়, ওইদিন বেলা ১২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বৈঠক শুরু হবে। বিরোধী দল কমিটিতে যোগ দেয়নি। ফলে ১২ সদস্যের কমিটি নিয়ে প্রথম বৈঠক শুরু হচ্ছে।
জানা গেছে, পরিচিতি এবং পরবর্তী বৈঠকের আলোচনার বিষয় নির্ধারণের মধ্যে হয়ত প্রথম দিনের বৈঠক সীমাবদ্ধ থাকবে। দ্বিতীয় বৈঠক থেকে সংবিধান সংশোধন নিয়ে কার্যকর আলোচনা হবে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের দাবির ধারাবাহিকতায় সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয় বর্তমান সরকার। সংবিধানের বিভিন্ন বিধান, বিশেষ করে ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা চলে আসছিল। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়। গত ১৩ জুলাই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার দাবি করে আসছিল।
কমিটি গঠনের দিন সংসদে দাঁড়িয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছিলেন, বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনে কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ বিধি মোতাবেক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংসদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং জোটের সদস্যদের সমন্বয়ে এমনকি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত একটি কমিটি গঠনে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই লক্ষ্যে বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের কাছ থেকে এই অধিবেশনে নাম পাওয়ার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় দেরি হয়। ইতোমধ্যেই কয়েক দফা এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, কিন্তু তারা এখনও কোনও নাম আমার কাছে দেননি। এমন অবস্থায় আমরা ১৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
প্রস্তাবিত কমিটির কাঠামো তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি জানান, বিএনপি থেকে সাত জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি থেকে একজন, গণসংহতি আন্দোলন থেকে একজন, গণঅধিকার পরিষদ থেকে একজন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে একজন, স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্য থেকে একজন, বিরোধী দল থেকে পাঁচ জন। এই নিয়ে ছিল মোট ১৭ জন।
১৭ জনের মধ্যে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রেখে গত ১৩ জুলাই ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন চিফ হুইপ। বিরোধী দলের কাছ থেকে নাম পাওয়া গেলে তাদের পাঁচ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে বলেও জানান। জাতীয় সংসদে ওইদিন ১২ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়।
কমিটির সভাপতি কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কমিটির সদস্যরা হলেন– বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য চিফ হুইপ মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম, ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল হক, চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্য ফারজানা শারমিন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শাকিলা ফারজানা, শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল এবং বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ অলিউল্লাহ।
বিরোধী দলের দাবি ছিল, সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কারের জন্য কমিটি গঠন করতে হবে। কিন্তু সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির প্রস্তাব এবং পাস করার কারণে এর বিরোধিতা করে তারা। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনের বিরোধিতা করে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। বিরোধী জোটের সব সংসদ সদস্য সংসদ অধিবেশন ছেড়ে চলে যান।
গত ১ জুলাই বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদের এলডি হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জানিয়েছিলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে যে সংস্কার সনদ (চার্টার) তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিতে জনগণ গণভোট বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার সেই রায় বাস্তবায়ন করেনি। সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কারে সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাবো এবং জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
ডা. শফিকুর রহমান ওইদিন আরও বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৩১টি দৃশ্যমান রাজনৈতিক সংগঠন একটি সংস্কার সনদে একমত হয়। তার দাবি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া বাকি সব দল শেষ পর্যন্ত ওই সনদে সই করেছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে অর্থবহ করার বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার ছিল। গণভোটে যে রায় আসবে, তা সবাই মেনে নেবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই রায়ের ভিত্তিতে একটি সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল এবং সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল।