জুলাই গণঅভ্যূত্থান: জাতির আকাংখার প্রতীক
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ও বৈষম্যহীন সমতার বাংলাদেশ গড়ার নতুন আহবান। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, সুশাসন এবং ন্যায্য সমাজ গড়ার প্রত্যাশা। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক উত্তাল ও ঘটনাবহুল অধ্যায়। মানুষের বিশ্বাস জন্মেছিল, ইতিহাস এবার নতুনভাবে লেখা হবে! জুলাই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকুরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এটি পরে সরকারের নির্মম অবস্থানের কারণে আরো প্রবল হয়ে উঠেছিল যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। প্রায় ১৫০০ মানুষকে হত্যার প্রেক্ষিতে বিগত প্রায় পনের বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশকে অপশাসনেরপর ফ্যাসিস্ট হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হট্ৎ করেই নতুন মোড় নেয়, দীর্ঘ দেড় দশকের চরম ফ্যাসিবাদী শাসনের বির”দ্ধে প্রবল এক জনঢেউ সেদিন স্বৈরশাসক হাসিনার গদিকে কাপিয়ে তুলে অল্প সময়ের মধ্যেই তা তছনছ করে দেয়! খুনী হাসিনা পালিয়ে জীবন রক্ষা করে। দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা আন্দেলন শেষ ৩৬ দিনে রূপ নেয় অভূতপূর্ব অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এক গণবিপ্লবে। কোনভাবেই মুক্তিকামী জনতাকে রুখতে পারছিলনা ফ্যাসিষ্ট শক্তি। চরম ন্যাক্কারজনক এবং নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েও তারা জনতাকে মুকাবেলা করতে পরছিল না। এই গণজাগরণের সূত্রপাত ঘটে ২০২৪ এর জুন মাসে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে, যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য ৩০% চাকরির কোটা পুনর্বহাল করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এই কোটা বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু হাসিনা সরকার কোর্টের উপর ভর করে এটি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হলে এই সিদ্ধান্ত জনসাধারণ, বিশেষ করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে। জনগণের মধ্যে সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, ব্যাপক দুর্নীতির, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা পরিবর্তনের পথ রূদ্ধ করা সহ নানাবিধ গণবিরোধী সিদ্ধন্থের বির”দ্ধে জনরোষ থাকার কারণে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনকে আরও বেগবান করে।
সরকারি চাকুরির নিয়োগ ব্যবস্থায় কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভের মধ্যে ২০১৮ সালে সরকার কর্তৃক জারি করা সার্কুলারকে ৫ জুন ২০২৪ তারিখে অবৈধ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। ঘোষণার পরপরই, শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে এবং বিভিন্ন শ্রেণীর লোকদের জন্য ৫৬% চাকরি সংরক্ষণ করার সুবিধা দেয়ার কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাসহ সারাদেশের ছাত্রসমাজ কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে রাজপথে নেমে আসে। অপর দিকে সরকার তার পেটোয়া বাহিনীকে নামিয়ে কঠোর ভাবে আন্দোলনকে দমন করতে শুরু করে। ফলে আন্দোলনকারীরা ১৬ জুলাই বিকাল ৩টায় দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেন। সারাদেশে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক বিক্ষোভ করে। আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের লোকজন হামলা চালায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তুমুল সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন শহীদ হয়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ নির্মমভাবে নিহত হওয়ার ফুটেজ ও ছবি এদিন ভাইরাল হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা পাল্টা লড়াই করে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করতে শুরু করে বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে। সর্বপ্রথম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ মুক্ত হয়। সেখানের বশির ভাগ হলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা। এর প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার সরকার দেশব্যাপী স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়। কিন্তু পরদিন গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে শিক্ষার্থীরা। আন্দেলন নতুন গতি পায়।
১৭ জুলাই শিক্ষার্থীরা সারা দেশে পরিবহণ চলাচল বন্ধ রাখর জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির আহ্বান জানায়। এ কর্মসূচির প্রেক্ষিতে ১৮ তারিখ ঢাকায় ও অন্যান্য ৪৭টি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী পরিবহন বন্ধ কার্যকর করার জন্য অন্যান্য বিভিন্ন গ্রুপের সাথে যোগ দেয়। পুলিশ ও অজ্ঞাত ব্যক্তিরা বুলেট, শটগানের গুলি ও রাবার বুলেট দিয়ে তাদের উপর গুলি চালালে কমপক্ষে ২৯ জন শহীদ হওয়ার নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়। পুলিশ ও ছাত্রলীগের লোকজন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। সারা দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয় এবং মেট্রো রেলের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়। ১৯ জুলাই শেখ হাসিনা সরকার মধ্যরাতে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে এবং দিনব্যাপী সহিংসতায় কমপক্ষে ৬৬ জন নিহত হওয়ার পর সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা হত্যার প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। হাজার হাজার মানুষ বিচারের জন্য মিছিলে যোগ দেয়। বিক্ষোভকারীরা দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং ৪ আগস্ট থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। ৩ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দেলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেন যে, তাদের সরকারের সাথে আলোচনার কোন পরিকল্পনা নেই এবং হাসিনার পদত্যাগ এবং ‘সবার কাছে গ্রহণযোগ্য’ একজন ব্যক্তির নেতৃত্বে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের দাবিতে লংমার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। হাসিনা আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ছাত্ররা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। অবশেষে এলা সেই কাংখিত দিবস! ৫আগস্ট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ কারফিউ অমান্য করে, বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ এ সন্ত্রাসীদের হামলা অগ্রাহ্য করে ‘মার্চ টু ঢাকা’ ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও দেশবাসী রাজধানী অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। দুপুর নাগাদ রাজধানীর কেন্দ্রে একত্রিত হয়। এরপর হাসিনা তার বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সামরিক বিমানে করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যায়।
এ বিপ্লবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিবাদী ভূমিকা জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে সেই সময়ে। লেখক খুব কাছে থেকেই সেসব প্রত্যক্ষ করেছেন। সংগ্রামের দিনগুলিতে ছাত্র-ছাত্রীদের কখনোই একা ছেড়ে দেননি ড. জোহার উত্তসূরীগণ! ১৮ জুলাই শিক্ষার্থীদের ঘোষিত সারাদেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ‘নিপীড়ন বিরোধী ছাত্র-শিক্ষক ঐক্য’ ব্যানারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ সংহতি সমাবেশ করে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক সে সমাবেশে অংশ গ্রহণ করেন। ছাত্র-ছাত্রীরা এতে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়। ৩১ জুলাই হত্যা, গণগ্রেফতার, হামলা, মামলা, জোরপূর্বক গুম এবং ছাত্র ও নাগরিকদের হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে ছাত্ররা ‘মার্চ ফর জাস্টিস' নামে প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করার ঘোষণা দেয়। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ‘নিপীড়ন বিরোধী ছাত্র-শিক্ষক ঐক্য’ ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল শেষে মেইন গেটে সমাবেশ করেন। শিক্ষার্থীরাও নয়টি সুনির্দিষ্ট দাবির পক্ষে দেশব্যাপী ঘোষিত কর্মসূচীর সমর্থনে দুপুর ১২ টায় বিক্ষোভ সমাবেশ করে। কর্মসূচির সমর্থনে রাজশাহীর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা আগের দিনের অসহযোগ আন্দোলন ও সরকার পতনের ১ দফায় রাজশাহীর সর্বস্তরের মানুষকে রাস্তায় নেমে এসে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। ফলে ব্যাপকহারে সাধারণ মানুষ সেদিন সকাল থেকেই নগরীর তালাইমারী মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। কিযে উৎসাহ আর উদ্দীপনা ছিল জনতার মাঝে তা না দেখলে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না! ছোট বাচ্চা সহ মা সেদিন নেমে এসেছিল! সকাল সাড়ে ১০ টায় গণজমায়েত শুরু হয়। টানা দুই ঘণ্টা হাজার হাজার মানুষ স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন তালাইমারিসহ আশপাশের এলাকা। দুপুর প্রায় সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তারা সেখানেই অবস্থান করেন! যদিও বারে বারেই তারা শহরের প্রাণকেন্দ্রে যাবার জন্য অগ্রসর হবার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু শহরময় ফ্যাসিবাদী গুন্ডাদের অবস্থান বিবেচনা করে উপস্থিত শিক্ষকগণ ছাত্রদের সেদিকে না যাবার জন্য অনুরোধ করতে থাকেন। কিন্তু তাদের প্রচ- দাবী ছিল শহরকে গুন্ডামুক্ত করতে হবে। এ লেখকসহ শিক্ষকরা তাদেরকে ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করতে বলেন। কারণ তখন নানা সূত্র থেকে হাসিনার পালানোর খবর চাউর হতে শুরু করেছিল। তাছাড়া ব্যাপক গণদাবীর ফলে তারা শহরমূখে রওনা হয়। শিক্ষকদের তারা বিনয়ের সাথে জানায় যে, গত দুুদিন তারা শিক্ষকদের কথা শুনেছে। আজ তাদেরকে যেতে দিতে হবে! অবশেষে জনতার মিছিল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর সাহেব বাজারের দিকে রওনা হয়। এদিকে নগরীর প্রবেশমূখ আলুপট্টি মোড়ে আগে থেকেই সশস্ত্র অবস্থানে ছিল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। আন্দোলনকারীদের মিছিলটি আলুপট্রি মোড়ে পৌঁছালে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের উপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। যুবলীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসী দুই হাতে গুলি চালানো রুবেল এ বর্বর হামলায় নেতৃত্ব দেয়। এরপরও আন্দোলনাকারীরা সামনে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ সদস্যরা সেখানে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে বাকশালী ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের উপর পুনরায় আক্রমণ শুরু করে। আন্দোলনকারীদের উপর মুহুর্মুহু গুলি ছোড়া হয়। বিপরীতে আন্দোলনকারীরা ইট-পাটকেল ছুড়ছিলেন! সশস্ত্র হামলায় অন্তত শতাধিক মানুষ আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন সড়কে। এরমধ্যে একজন ছিলেন আলী রায়হান, তার মাথায় গুলি লাগে। রায়হানসহ গুলিবিদ্ধ ৩০ জনকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আলী রায়হানের মৃত্যু হয়। এ সময় কাছাকাছি শাহ মখদুম কলেজ সংলগ্ন এলাকায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া আন্দোলনকারী সাকিব আঞ্জুমকে ধরে নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে শহীদ করা হয়। তাদের ত্রিমুখী হামলার মধ্যেও আন্দোলনকারীরা প্রতিরোধের ব্যাপক চেষ্টা করে। এভাবে দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত হামলা চলে। লেখক খুব কাছে থেকে এ নৃসংশতা দেখেছিলেন সেদিন! সেদিন সে মিছিলেই ছিলেন। নির্বিচারে গুলিবর্ষণ আর শত মানুষকে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য বড় অসহায়ের মতো তারা দেখেছেন। এ দুঃসহ স্মৃতি তাদের মনে চির জাগরুক থাকবে। যেমন ভাবে থাকবে মিছিলের সাথে ঐদিন যাওয়া আর আসার পথে দেখা সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা. ত্যাগ আর সার্বিক সহযোগিতার কথা! যে যেমনভাবে পেরেছে সামর্থ্য আর যোগ্যতা অনুসারে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তারা দাঁিড়য়েছিল সেদিন!!
২০০৯ সালের পিলখানায় ৫৭ জন চৌকষ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের নৃসংশ হত্যাকান্ড, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্ত্বর হত্যাকান্ডের মত বর্বর ঘটনাবলী ফ্যাসিবাদের বিভৎস রূপকে জাতির সামনে উন্মোচিত করে। তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা, সাজানো ও বানোয়াট মামলায় একের পর এক বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে কারাগারে আটক করা হয়। রিমান্ডে নিয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হয় ও মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়া হয়। আয়নাঘর এবং ক্রসফায়ারে নিয়ে বহু মানুষকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়ে জনমতকে উপেক্ষা করে কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করে ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে ইতিহাসের নজিরবিহীন প্রহসনের নির্বাচনী নাটক মঞ্চস্থ করে! দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট, বিদেশে অর্থ পাচার, দলীয় করণের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক পরিবেশ চরম অবনতির দিকে আগাতে থাকে। তৎকালীন আইজিপি, সেনা প্রধান, র্যাবের ডিজিসহ সর্ব পর্যায়ে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে দেশের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শেখ হাসিনা ও তার পরিবার দেশকে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সন্ত্রাসের রাজত্বে পরিণত করে। দীর্ঘ ১৫বছরের এ জুলুমতন্ত্রের অবসানে হাজারো প্রাণের শাহাদাত, অগণিত আদম সন্তানের পঙ্গুত্ববরণ, হাজার হাজার মানুষের গুম-খুনের বিনাময়ে অর্জিত হয়েছিল মুক্তি-২০২৪ এর বিজয় ও মুিক্ত! এই মুক্তি যে মানুষের কত আকাঙ্খার ছিল তা প্রমাণিত হয় যখন দেখা যায় জনতা-মিডিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই বিজয় কে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল!
চলতি সালের ৯ জুলাই বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস তাদের ইউটিউব চ্যানেলে একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করে। প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বিবিসি এর যাচাই করা এক অডিও রেকর্ডিং অনুসারে শেখ হাসিনা তার নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার’ করার নির্দেশ দেন। নিজের স্বজাতি যারা গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াই করছিল তাদের বির”দ্ধে এধরণের নিকৃষ্ট হামলার নির্দেশনা সভ্য সমাজে কল্পনা করা যায় না!! এমনকি পাক হানাদারকেও কোন কোন ক্ষেত্রে এই ফাসিবাদী গোষ্ঠী ছেড়ে গেছিল! গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মারাত্মক এক অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রাথমিক তদন্তে প্রতিবাদকারীদের গণহত্যায় হিন্দিভাষী সশস্ত্র কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আহতরা অভিযোগ করেছেন যে, এসব ব্যক্তিরা হিন্দিভাষী ছিলেন! ঐ সময়ে এসব ঘটনার পেছনে ভারতের র-এর জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছিল একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে। হিন্দীভাষীরা হয়তো তাদেরই কেও হবেন এটা বলাই যায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। ১১৪ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন বলা হয়েছে, সাবেক সরকার এবং এর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাবাহিনী আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সহিংস উপায় ব্যবহার করে গুর”তর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এতে শতশত বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক বলপ্রয়োাগ করা হয়। একইসঙ্গে নির্বিচারে আটক, নির্যাতন এবং অন্যান্য ধরনের নিগ্রহের ঘটনা ঘটে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর মনে করে, বিক্ষোভ এবং ভিন্নমত দমনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অবগতি, সমন্বয় এবং নির্দেশনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনাকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি অপরাধ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশন। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ০৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত গণহত্যায় ১৪০০ জনের বেশি নিহত হন। নিহতদের ৭৮% প্রাণঘাতী গুলির আঘাতে মারা গেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পর সুশাসনের চিত্র নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন রয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ, তেমনি রয়েছে নানা প্রত্যাশা ও আশাও। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের নানাবিধ লক্ষ্য ও আকাঙখা থাকলেও দেশে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা ছিল অন্যতম প্রধান দাবি। শত শত মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, দুই বছর পর সেই প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে তা নিয়ে এখন রাজনীতি ও নাগরিক সমাজে উঠছে নানা প্রশ্ন। ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল সংস্কার বা সিস্টেমেটিক চেঞ্জই সুশাসনের মূল ভিত্তি। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো আমাদের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা এবং জনগণের কাছে সেগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণ মুক্ত করা না গেলে কখনোই কাঙিখত সুশাসন সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর জমা দেয়া রিপোর্টগুলো এক্ষেত্রে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। গণহত্যার বিচার উপযুক্ত বিচার করতে হবে। অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা আনা, সুশাসন নিশ্চিত করতে স্বাধীন বিচার বিভাগ, কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন, শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন অপরিহার্য। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুসংগঠিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান নির্বাচিত সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার তাদের প্রতিশ্রুত ‘৩১ দফা’ অনুযায়ী সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে গত ৫ মাসে কাঙিক্ষত প্রত্যাশা পূরণ না হলেও সরকারকে আরও সময় দিতে হবে। এ স্বল্প সময়ে চূড়ান্ত কথা বলার সময় আসেনি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগসহ প্রায় প্রতিটি যন্ত্র ধসে করেছিল। অভ্যুত্থানের পর সুশাসনের শতভাগ প্রত্যাশা এখনও পূরণ না হলেও একটি ইতিবাচক দিক হলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বা তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’-এর মতো ঘটনা এখন পর্যন্ত ঘটেনি। এটি ইতিবাচক পরিবর্তন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান কেবল স্বৈরাচারী সরকারের পতন ছিল না; তা ছিল শোষণ, দুর্নীতি ও বেকারত্বমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার বজ্র শপথ। ২৪-এর মাধ্যমে আমরা এক নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছি। আমরা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, যেখানে লুটপাট, অর্থপাচার, দারিদ্র, বেকারত্ব, সন্ত্রাস, অবিচার, বৈষম্য ও ভিন্নমত দমন থাকবে না। আমাদের জাতিসত্ত্বা ও মূল্যবোধবিরোধী আধিপত্যবাদীদের সেবাদাস কোন কর্তৃত্ববাদী শাসন থাকবে না। রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। দলীয়করনমুক্ত এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, বিচার ও সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাঠামো আমাদের প্রত্যাশা- যেখানে কোন নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না। প্রতিবেশী ভারতসহ সবার সঙ্গে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক, যেখানে অন্যায্য হস্তক্ষেপ, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, সীমান্ত হত্যা, বৈষম্যপূর্ণ পানি বন্টননীতি এবং দেশের স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক খিচুই থাকবে না। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্নের কাঙিখত বাস্তবায়ন হয়নি। স্বৈরশাসনের অবসান ঘটলেও প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে পুরোনো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার ছায়া এখনো বিদ্যমান। নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার এই লড়াই আমাদের এক কঠিন যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও নীরবতাই নির্ধারণ করবে আগামীর পথরেখা। শহীদদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথে অর্জিত স্বাধীনতার আলো যেন ক্ষণিকের অবহেলা কিংবা নীরবতার আঁধারে নিভে না যায়। এই মহান অর্জনকে শুধু স্মরণে রাখা নয়, বরং তাকে রক্ষা ও হৃদয়ে ধারণ করাই হোক আমাদের সবার পবিত্র যৌথ অঙ্গীকার।
লেখক: ড. ইফতিখার”ল আলম মাসউদ
প্রফেসর, আরবী বিভাগ এবং রেজিস্ট্রার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।