মেসির অবসর, বার্সায় ফেরানোর চেষ্টা ও ইয়ামাল নিয়ে যা বললেন জাভি
লিওনেল মেসিকে নিয়ে নতুন করে অনেক অজানা কথা সামনে এনেছেন বার্সেলোনার কিংবদন্তি ও সাবেক কোচ জাভি হার্নান্দেজ। আর্জেন্টাইন তারকার অবসরের ঘোষণার পর এক পডকাস্টে মেসির সঙ্গে নিজের দীর্ঘ পথচলা, তার অসাধারণ প্রতিভা, অবসর নেওয়ার মানসিকতা এবং তাকে বার্সেলোনায় ফেরানোর চেষ্টা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন জাভি।
ওই পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাভি জানিয়েছেন, মেসিকে প্রথম দেখার সময়ই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন- এই কিশোর অন্যদের চেয়ে আলাদা। তখন মেসির বয়স মাত্র ১৬ বছর। বার্সেলোনার একটি সফরকারী দলের সঙ্গে ছিলেন জাভি ও মেসি। অনুশীলনে সেই কিশোরের ফুটবল দেখে মুগ্ধ হয়ে যান জাভি।
তার ভাষায়, প্রথম দিন থেকেই মেসির মধ্যে এমন কিছু দেখেছিলেন, যা তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। অনুশীলনে বার্সেলোনার সেরা ডিফেন্ডারদেরও মেসি এমনভাবে ড্রিবল করে পার হয়ে যেতেন, যেন সেটি তার জন্য খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
জাভির চোখে, মেসির প্রতিভা শুধু গোল করা কিংবা ড্রিবলিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মাঠে খেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিস্থিতি বোঝার যে ক্ষমতা মেসির ছিল, সেটিই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
মেসিকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে উল্লেখ করে জাভি তার সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর তুলনাও টেনেছেন। জাভির মতে, রোনালদো নিঃসন্দেহে অসাধারণ একজন গোলস্কোরার। কিন্তু মেসির বিশেষত্ব আরও বিস্তৃত। তিনি মাঠের বিভিন্ন পজিশনে খেলতে পারতেন এবং খেলার গতিপথ বুঝতে পারতেন অন্যদের তুলনায় অনেক ভালোভাবে।
জাভির ব্যাখ্যায়, মেসি প্রয়োজনে ‘সিক্স’, ‘এইট’ কিংবা ‘ফলস নাইন’- বিভিন্ন ভূমিকায় খেলতে পারতেন। অর্থাৎ শুধু আক্রমণভাগে দাঁড়িয়ে গোল করার জন্য নয়, মাঝমাঠ থেকে খেলা পরিচালনা করা কিংবা নিচে নেমে বল তৈরি করার ক্ষেত্রেও তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। এই বহুমাত্রিকতাই মেসিকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে আলাদা করেছে বলে মনে করেন জাভি।
মেসিকে বার্সায় ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন জাভি
মেসির সঙ্গে আবারও বার্সেলোনায় কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন জাভি। সাবেক এই বার্সা কোচের দাবি, মেসিকে ক্লাবে ফেরানোর বিষয়ে প্রায় চার মাস ধরে আলোচনা হয়েছিল।
জাভির ভাষায়, এটি হতে পারত মেসির ক্যারিয়ারের একটি ‘শেষ নাচ’—অর্থাৎ বার্সেলোনার জার্সিতে আরও একবার মাঠে নামার সুযোগ। মেসি এবং কোচিং স্টাফ- দুই পক্ষই সম্ভাব্য এই পুনর্মিলন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নেয়নি। মেসির বার্সেলোনায় প্রত্যাবর্তন হয়নি। এরপর আর্জেন্টাইন তারকা নিজের ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায় অন্যত্র চালিয়ে যান।
বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির সম্পর্ক অবশ্য শুধু একজন খেলোয়াড় ও ক্লাবের সম্পর্ক নয়। ক্লাবটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায় জুড়ে রয়েছে আর্জেন্টাইন তারকার নাম। সেই কারণেই তাকে আবার বার্সেলোনার জার্সিতে দেখার সম্ভাবনা সমর্থকদের কাছে বিশেষ আবেগের বিষয় ছিল।
সবকিছু জিতেও জয়ের ক্ষুধা কমেনি
মেসির মানসিকতা নিয়েও কথা বলেছেন জাভি। এত বছর ধরে প্রায় সব ধরনের ব্যক্তিগত ও দলীয় সাফল্য অর্জনের পরও মেসির মধ্যে জেতার ক্ষুধা কখনো কমেনি বলে মনে করেন তিনি।
বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য শিরোপা জেতার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপও জিতেছেন মেসি। ব্যক্তিগতভাবেও আটবার ব্যালন ডি’অরসহ বহু পুরস্কার রয়েছে তার ঝুলিতে। তবু আরও জেতার আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি কখনো সরে আসেননি- এমনটাই জাভির পর্যবেক্ষণ।
জাভির মতে, মেসি ছিলেন একজন ‘অদম্য প্রতিযোগী’- অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যার থামার কোনো মানসিকতা ছিল না। যত বেশি জিতেছেন, তত বেশি নতুন কিছু অর্জনের চেষ্টা করেছেন।
তবে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে জাভির বক্তব্য কিছুটা ভিন্ন। মেসি ক্যারিয়ারে প্রায় সবকিছু অর্জন করার পর অবশেষে সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন এবং এ নিয়ে তিনি শান্তিতে আছেন বলেই মনে করেন জাভি।
তার মতে, মেসি ফুটবলে যা যা জেতার ছিল, প্রায় সবই জিতেছেন। তাই ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে অবসর নিয়ে তার মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তি থাকা স্বাভাবিক।
মেসির ছায়া দেখছেন লামিনে ইয়ামালে
বার্সেলোনার বর্তমান কিশোর তারকা লামিনে ইয়ামালের সঙ্গেও মেসির তুলনা করেছেন জাভি। ইয়ামালকে মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রথম দেখেছিলেন বলে জানিয়েছেন সাবেক এই বার্সা কোচ।
ইয়ামালের মধ্যেও মেসির মতো অসাধারণ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন তিনি। জাভির বিশ্বাস, বর্তমান প্রজন্মের সেরা ফুটবলার হওয়ার মতো সব উপাদান ইয়ামালের মধ্যে রয়েছে।
মেসির সঙ্গে ইয়ামালের তুলনা টানতে গিয়ে জাভি মূলত দুজনের প্রতিভা, খেলার ধরন ও অসাধারণ সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তার চোখে, মেসি যেমন নিজের প্রজন্মকে দীর্ঘ সময় ধরে শাসন করেছেন, ইয়ামালের সামনেও তেমন একটি পথ খোলা রয়েছে।
তবে মেসির সঙ্গে তুলনা যে ইয়ামালের জন্য বিশাল প্রত্যাশা তৈরি করে, সেটিও স্পষ্ট। মাত্র কৈশোর পেরোনোর বয়সেই বার্সেলোনার মূল দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন ইয়ামাল। আর জাভির মতো মেসির সতীর্থ ও সাবেক কোচ যখন তার মধ্যে ভবিষ্যতের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন, তখন বার্সেলোনার এই তরুণ তারকাকে ঘিরে প্রত্যাশা আরও বাড়ছে।
মেসির ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় এবং বার্সেলোনায় তার প্রত্যাবর্তনের অপূর্ণ গল্পের পাশাপাশি জাভির বক্তব্যে তাই নতুন প্রজন্মের ইয়ামালের প্রসঙ্গও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একজনের ক্যারিয়ার যখন শেষের দিকে, তখন আরেকজনকে ঘিরে বার্সেলোনার ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন ক্লাবটিরই এক কিংবদন্তি।