প্রথমবারের মতো এআই দিয়ে তৈরি হলো নতুন ভাইরাস, নিরাপত্তা শঙ্কা

New virus created with AI, security concerns
অনলাইন ডেস্ক ০৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫১ পূর্বাহ্ন তথ্যপ্রযুক্তি
অনলাইন ডেস্ক ০৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫১ পূর্বাহ্ন
প্রথমবারের মতো এআই দিয়ে তৈরি হলো নতুন ভাইরাস, নিরাপত্তা শঙ্কা
--সংগৃহীত ছবি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নতুন কার্যকর ভাইরাস তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই সাফল্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করা হলেও, একই সঙ্গে এটি জীবনিরাপত্তা (বায়োসেফটি) ও অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগও তৈরি করেছে।


গবেষণায় তৈরি হওয়া ১৬টি নতুন ভাইরাস কেবল ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে এবং মানুষের জন্য কোনো হুমকি নয়। গবেষকদের মতে, এই সাফল্য ভবিষ্যতে রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। 


এর আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নতুন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির কাজ হলেও, শুরু থেকে সম্পূর্ণ কার্যকর একটি ভাইরাসের নকশা তৈরি করা ছিল অনেক বেশি জটিল।


যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ান হাই বলেন, ‘এটি এমন এক নতুন পর্যায়, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রথমবারের মতো একটি সম্পূর্ণ জিনগত বিন্যাস তৈরি করেছে, যা কোষের ভেতরে বংশবিস্তার ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম।’


এই প্রযুক্তি ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতোই কাজ করে। যেমন কথোপকথনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শব্দের পরবর্তী ক্রম অনুমান করে, তেমনি ‘ইভো–১’ ও ‘ইভো–২’ নামে পরিচিত এই মডেলগুলো জীবনের জিনগত ভাষা বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস দেয়।


গবেষকেরা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ ও মানুষের জিনগত তথ্য দিয়ে এই মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেন। পরে এগুলোকে এমনভাবে উন্নত করা হয়, যাতে তারা ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিতকারী বিশেষ ধরনের ভাইরাস তৈরি করতে পারে।


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ৩০২টি সম্ভাব্য নকশা তৈরি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় নকশাগুলো পরীক্ষাগারে তৈরি করা হলে ১৬টি নতুন ভাইরাস ‘ই. কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।


গবেষক দলের সদস্য স্যামুয়েল কিং বলেন, ‘পরীক্ষার সময় ব্যাকটেরিয়ার স্তরের ওপর পরিষ্কার দাগ দেখা দেওয়ার মাধ্যমে তারা বুঝতে পারেন নতুন ভাইরাসগুলো কার্যকর হয়েছে। ফলাফল পুরো গবেষক দলের সামনে উপস্থাপন করা হলে উপস্থিত সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে করতালিতে ফেটে পড়েন।’


গবেষকদের মতে, এ ধরনের নতুন ভাইরাস ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি কৃত্রিমভাবে নতুন জৈব কাঠামো তৈরির প্রযুক্তি বা সংশ্লেষিত জীববিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।


ব্রায়ান হাইয়ের ভাষায়, এই প্রযুক্তি নতুন ওষুধ এবং চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের অগ্রগতি আনতে পারে।


তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, একই প্রযুক্তি অপব্যবহার করে নতুন রোগ সৃষ্টির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত গবেষণার সঙ্গে থাকা এক বিশ্লেষণে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা কেন্দ্রের গবেষক থমাস ইংলেসবি ও মরিটজ হ্যাঙ্কে বলেন, ‘এই অগ্রগতি জীববৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে জরুরি প্রশ্ন তৈরি করেছে।’


তাদের মতে, এখন আর প্রশ্ন নয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভাইরাসের জিনগত নকশা তৈরি করা সম্ভব কি না; বরং প্রশ্ন হলো, এটি কীভাবে এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে যাতে গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি না হয়। বিশেষ করে রোগ সৃষ্টির সক্ষমতা থাকতে পারে—এমন নতুন ভাইরাস তৈরির চেষ্টা করা উচিত নয়।


গবেষকেরা জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা মানুষের মতো জটিল জীবকে সংক্রমিত করতে পারে এমন ভাইরাস প্রশিক্ষণের তথ্যভান্ডার থেকে বাদ দিয়েছেন। গবেষণাটি শুধু ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমণ ঘটানো ভাইরাস নিয়ে নিরাপদ পরীক্ষাগারে পরিচালিত হয়েছে।


ব্রায়ান হাইয়ের মতে, বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থাই প্রযুক্তিটির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে অনেকটাই কার্যকর।


গবেষকদের ভাষ্য, ভাইরাস জীবন্ত নয়। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সম্পূর্ণ জীবন্ত প্রাণী তৈরি করতে আরও বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি প্রয়োজন।


স্পেনের পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লেষিত জীববিজ্ঞান গবেষণাগারের অধ্যাপক মার্ক গুয়েল এই গবেষণাকে বিজ্ঞানের জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ইতিহাসে এই প্রথম কম্পিউটারে বসে জীববৈজ্ঞানিক নকশা তৈরির যুগের সূচনা হলো। এর মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধী ভাইরাস, বংশগত রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় উৎসেচক এবং রোগপ্রতিরোধভিত্তিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রতিরক্ষাকারী উপাদান তৈরির মতো নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।


অন্যদিকে ম্যানচেস্টার জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লেষিত জিনতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক প্যাট্রিক কাই বলেন, ‘এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।’ তার মতে, এর গুরুত্ব শুধু ব্যাকটেরিয়াভুক ভাইরাসেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেখিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা জিনগত নকশার মূল নীতিগুলো বুঝতে শিখছে, যা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় জিনগত বিন্যাস তৈরির নতুন পথ খুলে দিতে পারে।