আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হোক অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার, মাতৃভাষায় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন আইনজীবী ও আদিবাসী অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট প্রভাত টুডু। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের দিন নয়, এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে উত্তরা প্রতিদিনের এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। অ্যাডভোকেট প্রভাত টুডু বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক।
তিনি বলেন, ‘আদিবাসী’ পরিচয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পরিচয়। এর সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের সংগ্রামের সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শব্দটি দিয়ে এই জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অ্যাডভোকেট টুডুর মতে, পরিচয় মানুষের আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয় ও সংস্কৃতিকে সম্মান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের অন্যান্য নাগরিকের মতো তাদেরও সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমি অধিকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বর্তমান সমস্যাগুলোর মধ্যে ভূমি অধিকারকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভূমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবিকা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ভূমি বিরোধ ও দখলসংক্রান্ত সমস্যার অভিযোগ করে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে ভূমি হারানোর কারণে তারা শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, একই সঙ্গে নিজেদের ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিসর থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আদিবাসীদের ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এবং বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানেও বৈষম্যের অভিযোগ
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানান অ্যাডভোকেট টুডু।
বিশেষ করে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা আদিবাসী শিশুদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাংবিধানিক স্বীকৃতির গুরুত্ব
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি তাদের পরিচয় ও মর্যাদার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের অধিকার, সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়গুলো আরও শক্তিশালী ভিত্তি পেতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নীতি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে অনেক বিরোধ ও সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
ভূমি হারালে হারায় সংস্কৃতির শিকড়
অ্যাডভোকেট প্রভাত টুডু বলেন, ভূমি হারানো শুধু একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় নয়। এর সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন, উৎসব, কৃষিভিত্তিক জীবনযাপন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য জড়িত।
তাই ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের উদ্যোগ আরও কার্যকর করার আহ্বান
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে এসব উদ্যোগের পরিধি আরও বাড়ানো এবং বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, নীতিনির্ধারণের পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
আগামীর বাংলাদেশ কেমন দেখতে চান?
আগামী দিনের বাংলাদেশ সম্পর্কে নিজের প্রত্যাশা তুলে ধরে অ্যাডভোকেট প্রভাত টুডু বলেন, তিনি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চান যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকবে, ভূমির অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ বাড়বে এবং সব নাগরিক সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবেন।
তিনি বলেন, “আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। পারস্পরিক সম্মান, সম্প্রীতি ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।”
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে তিনি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে মানববন্ধন, আলোচনা সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও দাবি তুলে ধরার আহ্বান জানান।
অ্যাডভোকেট প্রভাত টুডুর মতে, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিত পরিচয়ের স্বীকৃতি, অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈচিত্র্যের মর্যাদা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।