পদ্মা রেল প্রকল্পে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকার অডিট আপত্তি
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সরকারি বিশেষ নিরীক্ষায়। প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে নকশা পরিবর্তনের পরও অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মালামাল আমদানি, কাজের তুলনায় বেশি বিল প্রদান এবং অনুমোদন ছাড়া ব্যয়সহ ২০টি অডিট আপত্তিতে এ বিপুল অঙ্কের অর্থের বিষয় উঠে এসেছে।
অডিটে উত্থাপিত এসব আপত্তির মধ্যে প্রকল্পের তৎকালীন পরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের দায় নিরূপণ করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে অভিযোগ ওঠার পরও আফজাল হোসেন বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি তার পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি নিরীক্ষার পাশাপাশি রেলওয়ের বর্তমান ডিজির বিরুদ্ধে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ কেনায় ৬৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও তদন্তাধীন বলে জানা গেছে। অভিযোগের পর রেলপথ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সংশ্লিষ্টদের গত ৬ জুলাই প্রমাণপত্রসহ শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়েছিল। তবে তদন্ত শেষ হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সবচেয়ে বড় আপত্তি ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণে:-
সরকারি বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় অঙ্কের আপত্তি তোলা হয়েছে ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণকাজে। অডিটের হিসাবে, নকশায় নির্ধারিত উচ্চতার তুলনায় গড়ে ১ দশমিক ৭ মিটার কম মাটি ভরাটসহ বিভিন্ন কাজ কম করার পরও ঠিকাদারকে শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।
২০১৬ সালে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের সঙ্গে প্রকল্পটির ইপিসি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী রেললাইনের বাঁধ নির্মাণে গড় উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ দশমিক ৩ মিটার। পরবর্তী জরিপে তা কমিয়ে ৫ দশমিক ৬ মিটার নির্ধারণ করা হয়।
অডিট বলছে, নকশা পরিবর্তনের ফলে মাটি ভরাট, পিভিডি, জিওটেক্সটাইল, সিমেন্ট মিক্সিং পাইল, ব্রিজ ও কালভার্টসহ বিভিন্ন কাজের পরিমাণ কমে যায়। কিন্তু কাজের পরিমাণ কমলেও বিল অব কোয়ান্টিটিজে (বিওকিউ) উল্লেখিত পুরো অর্থ ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়।
অডিটের হিসাবে, এতে ১৭ কোটি ৫৪ লাখ ৪৪ হাজার ডলার বা প্রায় ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, ঠিকাদারকে চুক্তি অনুযায়ী ডলারে বিল দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। বর্তমান ডলার বিনিময় হার ব্যবহার করে অডিট অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব করেছে বলেও দাবি করা হয়।
এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, বিওকিউতে দর বাংলাদেশি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে মূল্য সমন্বয়ও হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত পরিশোধিত অর্থ আদায়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তা করেনি।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত রেল আমদানির অভিযোগ:-
অডিটের আরেক আপত্তিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ২ হাজার ৮৫৫ টন ইউআইসি-৬০ রেল আমদানি করা হয়। এতে ঠিকাদারকে শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর বাবদ ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, কাজের পরিধি বাড়ায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-গেন্ডারিয়া তৃতীয় লাইন, ভাঙ্গা জংশন, রূপদিয়া, সিঙ্গিয়া ও পদ্মবিলা জংশনসহ বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত রেলের প্রয়োজন হয়েছিল। তবে এ ব্যাখ্যাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে অডিট কর্তৃপক্ষ।
আরও যেসব অনিয়মের অভিযোগ:-
সরকারি নিরীক্ষায় প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এর মধ্যে—
মূল স্পেসিফিকেশনের তুলনায় গড়ে ২০০ মিলিমিটার কম গ্রানুলার স্যান্ড ব্যবহার করেও ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধ;
টার্নকি বা ইপিসি চুক্তির শর্ত ভেঙে বিওকিউ বাড়িয়ে ৭২৮ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়;
দেশীয় মালামালের মূল্য বাংলাদেশি টাকার পরিবর্তে ডলারে পরিশোধ করে ৫১৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ;
প্রকল্পকে ‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখিয়ে প্রাক্কলনের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি দামে চুক্তি করায় ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ;
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তুলনায় বেশি কাজ দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল;
একই জমির মূল্য দ্বিতীয়বার নির্ধারণ করে ১৭১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত অনুদান;
ভাঙ্গা রেলস্টেশনের নকশা পরিবর্তনে ২৮৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়;
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া গাড়ি কেনায় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা;
ব্যালাস্টের পুরুত্ব কম দেওয়ার পরও ২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা পরিশোধ;
উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া জমির সীমানা পিলার স্থাপনে ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা;
চুক্তির বাইরে ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কেনায় ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা;
সরকারি জমির মূল্য ব্যক্তির নামে পরিশোধ দেখিয়ে ১১ কোটি ৫ লাখ টাকা;
অতিরিক্ত অর্থ ডিএসসিসিকে দিয়ে এফডিআরে রাখায় ৪১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা;
ভাঙ্গা জংশনে অতিরিক্ত মাটি ভরাট দেখিয়ে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং প্রভিশনাল সামের ওপর ওভারহেড চার্জ বাবদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
অডিট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এসব ব্যয়ের বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যার অধিকাংশই আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য সহায়ক নয়। কম কাজ বা চুক্তির বাইরে ব্যয়ের পরও ঠিকাদারকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানেও ডিজিকে ঘিরে অভিযোগ:-
পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট আপত্তির বাইরে রেলের ডিজি মো. আফজাল হোসেনকে ঘিরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করে অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে তার সন্তানদের নামে রাখা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগের আর্থিক লেনদেন যাচাই করতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহযোগিতা চেয়েছে দুদক।
তবে এসব অভিযোগ এখনো অনুসন্ধানাধীন। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় হয়নি।
টিআইবির উদ্বেগ:-
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মতো বৃহৎ প্রকল্পে এত বিপুল অঙ্কের অডিট আপত্তির বিষয়টি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তার মতে, তদন্তে মন্ত্রণালয়, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, রেলওয়ের কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্তের স্বার্থে রেলের ডিজিকে সাময়িক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করতে পারত। কিন্তু তা না করে পদোন্নতি দেওয়ায় জবাবদিহির ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।
‘অডিট আপত্তি উঠলেই অনিয়ম নয়’:-
অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের ডিজি মো. আফজাল হোসেনের বক্তব্য জানতে শনিবার দুপুরে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তায় প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি জানান, অডিটের অধিকাংশ আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং অনেক আপত্তি প্রত্যাহারও করা হয়েছে। এ বিষয়ে সর্বশেষ তথ্যের জন্য প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।
পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া বলেন, ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ একে একে জবাব দিচ্ছে। তার ভাষায়, অডিট আপত্তি উঠলেই সেটিকে অনিয়ম বলা যায় না।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তি, প্রকল্পের সাবেক পরিচালক থেকে বর্তমান রেলওয়ে ডিজি হওয়া আফজাল হোসেনকে ঘিরে অভিযোগ এবং দুদকের চলমান অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে রেল প্রশাসনের জবাবদিহি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এসেছে।