রাজশাহীতে কার্ড আসার আগেই প্রশ্নের মুখে ফ্যামিলি কার্ড ॥ পাঁচ উপজেলায় বিক্ষোভ ও মানববন্ধন

Family card under question even before it arrives
আবুল কালাম আজাদ ১২ আগস্ট ২০২৬ ০৭:৩৮ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ ১২ আগস্ট ২০২৬ ০৭:৩৮ অপরাহ্ন
রাজশাহীতে কার্ড আসার আগেই প্রশ্নের মুখে ফ্যামিলি কার্ড ॥ পাঁচ উপজেলায় বিক্ষোভ ও মানববন্ধন
সেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রমের শুরুতেই রাজশাহীতে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ।--সংগৃহীত ছবি

যে কর্মসূচির লক্ষ্য দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবার চিহ্নিত করে তাদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা, সেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রমের শুরুতেই রাজশাহীতে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ। তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে জেলার পাঁচ উপজেলায় বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও নিয়োগ বাতিলের দাবি উঠেছে। কোথাও রাজনৈতিক সুপারিশে নিয়োগের অভিযোগ, কোথাও আবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগ না পাওয়ার দাবি। এতে প্রশ্ন উঠেছে—সুবিধাভোগীর তালিকা তৈরির দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের নিয়োগই যদি বিতর্কিত হয়, তাহলে সেই তালিকার নিরপেক্ষতা কতটা নিশ্চিত হবে?


দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারের আলোচিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের আগেই রাজশাহীতে মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। জেলার একাধিক উপজেলায় তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব, অনিয়ম এবং যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।


গোদাগাড়ী, তানোর, বাগমারা, চারঘাট ও বাঘায় নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং নিয়োগের তালিকা বাতিলের দাবি উঠেছে। কয়েকজন প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, লিখিত পরীক্ষাসহ নিয়োগের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়েও রাজনৈতিক তদবিরের কারণে তাঁরা নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।


তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। তাঁদের দাবি, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেই স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


রাজশাহী জেলা প্রশাসনও বলছে, নিয়োগে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। ইউএনওদের নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


রোববার (৯ আগস্ট) গোদাগাড়ীতে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনে সমাবেশ শেষে তাঁরা ইউএনওর কার্যালয়ে গিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান।


তানোরে ৯৬ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৯ জন সুপারভাইজার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর শুরু হয় নতুন বিতর্ক। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নীতিমালা অনুসরণ না করে একটি পক্ষের প্রভাব ও সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 


সোমবার (১০ আগস্ট) উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে তাঁরা নিয়োগের তালিকা বাতিল এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুনরায় নিয়োগের দাবি জানান। একই সঙ্গে ইউএনও নাঈমা খানের অপসারণের দাবিও তোলেন তাঁরা।


তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান বলেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করেই ফল প্রকাশ করা হয়েছে। কারও নিয়োগে অসংগতি পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বাগমারাতেও একই ধরনের অভিযোগে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) মানববন্ধন করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় তাঁরা ইউএনও ও সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন।


বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়েছে। এখানে পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই।


চারঘাটে নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ আরও গুরুতর। কয়েকজন প্রার্থী দাবি করেছেন, লিখিত পরীক্ষা ও নিয়োগের অন্যান্য ধাপ পেরিয়েও রাজনৈতিক তদবিরের কারণে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। উত্তীর্ণদের তালিকা প্রকাশের পর পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।


চারঘাটে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রাজশাহী মহিলা কলেজের এক অনার্স শিক্ষার্থীকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা। ওই শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত আখ্যা দিয়ে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবারের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। তবে চারঘাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাশেদুজ্জামান বলেন, গোয়েন্দা তদন্ত প্রতিবেদনে ওই শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত বলা হয়েছে।


চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া ও নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে কাউকে নিয়োগবঞ্চিত করা হয়নি।


বাঘায় নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে বিতর্ক শুরু হয় পরীক্ষার সময় থেকেই। প্রার্থীদের একাংশ দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ ও সার্ভার জটিলতার অভিযোগ করেন। ফল প্রকাশের পর বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন। পরে ফলাফল স্থগিত এবং আবেদনের সময় বাড়ানো হয়।

এরই মধ্যে বাঘার ইউএনওকে বদলি করা হয়। তবে বিক্ষোভের সঙ্গে বদলির কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার। তাঁর দাবি, এটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ।


রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ফ্যামিলি কার্ডের মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ এখন আর শুধু চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগের বিষয় নয়; এটি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।


একদিকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ করছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের কর্মীদের ‘মূল্যায়ন’ করার দাবিও সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় আদৌ কোনো প্রভাব ফেলছে কি না।


সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফ্যামিলি কার্ডের মতো বৃহৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগে কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনায় এলে পুরো কর্মসূচির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতে প্রকৃত দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবার চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।


রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহীদুল ইসলাম বলেন, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখেছেন। ইউএনওদের নিয়োগের সম্পূর্ণ নীতিমালা অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা সেটিই করছেন। এখানে অনিয়ম করার সুযোগ নেই।


তবে জেলা প্রশাসক মনে করেন, নিয়োগের আবেদন প্রক্রিয়াটি মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইনে করা হলে পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা সম্ভব হতো।

ফ্যামিলি কার্ডের মতো বৃহৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির শুরুতেই মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ নিয়ে এমন বিতর্ক তৈরি হওয়ায় এখন বড় প্রশ্ন—প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্তের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বাছাই প্রক্রিয়াই যদি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে চূড়ান্ত সুবিধাভোগীর তালিকা কতটা নিরপেক্ষ থাকবে?