বাঘা শাহদৌলা সরকারি কলেজএকই সঙ্গে দুই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, তদন্তে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের প্রমাণ

Investigation reveals evidence of seniority violation
আবুল কালাম আজাদ ১৫ আগস্ট ২০২৬ ০৬:২৮ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ ১৫ আগস্ট ২০২৬ ০৬:২৮ অপরাহ্ন
বাঘা শাহদৌলা সরকারি কলেজএকই সঙ্গে দুই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, তদন্তে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের প্রমাণ
ছবি-বাঘা শাহদৌলা সরকারি কলেজ,রাজশাহী।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার শাহদৌলা সরকারি ডিগ্রি কলেজে একই সঙ্গে দুইজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক এবং অন্যজন কৃষিশিক্ষার শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম। জাহাঙ্গীর আলম জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও মব সৃষ্টি করে অধ্যক্ষের চেয়ার দখল করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 


মাউশির গঠিত তদন্ত কমিটিও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের সত্যতা পেয়েছে। তবে দেড় বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।জাতীয় সংবাদ অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় জাহাঙ্গীর আলম কলেজের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেন। বাঘা উপজেলা জিয়া পরিষদের সাবেক কৃষিবিষয়ক সম্পাদক পরিচয় দেওয়া জাহাঙ্গীর বর্তমানে নিজেকে বৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দাবি করছেন। অন্যদিকে আবু বক্কর সিদ্দিক কলেজের বৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হলেও দায়িত্ব পালন করছেন পারছেন না।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মব সৃষ্টি করে আবু বক্কর সিদ্দিককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর জ্যেষ্ঠতার তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে থাকা নিজেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ঘোষণা দিয়ে জাহাঙ্গীর আলম প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেন। এ ঘটনায় কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান মাউশির মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।


অভিযোগের পর মাউশি রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ অধ্যাপক কালাচাঁদ শীলকে প্রধান করে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির অপর সদস্য ছিলেন একই কলেজের শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম। তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ পাঁচ শিক্ষককে শাহদৌলা কলেজে ডাকা হয়।


তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক কালাচাঁদ শীল বলেন, ‘মাউশির মহাপরিচালকের কার্যালয় জ্যেষ্ঠতার তালিকা চেয়েছিল। আমরা সেটি দিয়েছি। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আর্থিক লেনদেনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন আবু বক্কর সিদ্দিক। আর দাফতরিক ও প্রশাসনিক দিক পরিচালনা করছেন জাহাঙ্গীর আলম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা প্রতিবেদন দিয়েছি।’


একই সঙ্গে দুইজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করতে পারেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি মাউশি বা মন্ত্রণালয় দেখবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা আমার জানা নেই।’


কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ,জাহাঙ্গীর আলমকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার মাউশির কোনো বৈধ নির্দেশনা তারা দেখেননি। এরপরও তিনি নিজের নামে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সিল তৈরি করেছেন এবং অধ্যক্ষের নামের তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনও (এসিআর) তিনি নিজেই দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থী ভর্তি ও অস্থায়ী নিয়োগে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী।


অন্যদিকে আবু বক্কর সিদ্দিক দাবি করেন, তাঁকে মব সৃষ্টি করে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পদত্যাগ যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি। সরকারি কর্মকর্তাদের পদত্যাগের জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। কিন্তু শুধু সাদা কাগজে পদত্যাগ করার কথা লেখা হয়েছে। এটি বিধিসম্মত নয়। আমি এখনো আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা (ডিডিও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমিই বৈধ অধ্যক্ষ।’


অভিযোগের বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আবু বক্কর সিদ্দিক পদত্যাগ করেছেন। তাই আমি এখন জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে দুই নম্বরে রয়েছি। রাজনৈতিক কারণে নয়, শিক্ষার্থীদের চাপে আবু বক্কর সিদ্দিক পদত্যাগ করেছেন। মব সৃষ্টির অভিযোগ সঠিক নয়।’


তবে মাউশি থেকে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে স্বীকার করেন জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের কাগজপত্র মাউশিতে পাঠিয়েছি। এখনো নির্দেশনা আসেনি।’


মাউশির নির্দেশনা না পাওয়ার পরও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন বৈধ কি না জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে কলেজে গিয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন।


ঐতিহ্যবাহী সরকারি এই কলেজে একই সঙ্গে দুই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা।