চিকিৎসাবর্জ্যের স্রোত ড্রেনে, যাচ্ছে নদী-খালে ॥ বাড়ছে পরিবেশ দূষন ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি

Medical waste flows down drains, into rivers and canals
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:২৯ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:২৯ অপরাহ্ন
চিকিৎসাবর্জ্যের স্রোত ড্রেনে, যাচ্ছে নদী-খালে ॥ বাড়ছে পরিবেশ দূষন ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি
রাজশাহীতে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তরল চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্রে এমনই উদ্বেগজনক বাস্তবতা উঠে এসেছে।

চিকিৎসা মানুষের জীবন বাঁচায়, কিন্তু সেই চিকিৎসার পর তৈরি হওয়া তরল বর্জ্যই যদি শোধন ছাড়াই নগরীর ড্রেনে গিয়ে মেশে, তাহলে সেই বর্জ্য হয়ে উঠতে পারে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকির উৎস। রাজশাহীতে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তরল চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্রে এমনই উদ্বেগজনক বাস্তবতা উঠে এসেছে। জেলার ২১৬টি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর তরল বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি রয়েছে মাত্র দুটিতে। বাকি ২১৪টি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠান রক্ত, শরীরের বিভিন্ন তরল, রাসায়নিক ও জীবাণুযুক্ত বর্জ্য যথাযথভাবে শোধন না করেই পয়োনিষ্কাশন বা ড্রেনেজ লাইনে ছেড়ে দিচ্ছে। নগরীর ড্রেন থেকে এসব বর্জ্য চলে যাচ্ছে নালা, খাল-বিল ও নদীতে। এতে শুধু রাজশাহী নগরী নয়, নগরীর আশপাশের গ্রামাঞ্চলের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।


২১৬ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইটিপি মাত্র দুইটিতে:-

রাজশাহী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, জেলায় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২১৬টি। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটিতে তরল বর্জ্য শোধনের জন্য কার্যকর ইটিপি রয়েছে।

অর্থাৎ ৯৮ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর তরল বর্জ্য শোধনব্যবস্থা নেই—যা চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।


ড্রেন থেকে নদীতে:-

রাজশাহী নগরীর হাসপাতালপাড়া হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুর এলাকায় প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ চিকিৎসাবর্জ্য। এর একটি অংশ কঠিন বর্জ্য হলেও হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক কার্যক্রমে তৈরি হয় বিপুল পরিমাণ তরল বর্জ্যও।


রক্ত, শরীরের বিভিন্ন তরল, পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত রাসায়নিক এবং জীবাণুযুক্ত উপাদান মিশে থাকা এসব বর্জ্য সাধারণ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় ছেড়ে দেওয়ার আগে শোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত শোধনব্যবস্থা না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান ড্রেন বা পয়োনিষ্কাশন লাইনের ওপর নির্ভর করছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।


নগরীর বিভিন্ন ড্রেনের পানি শেষ পর্যন্ত নগরীর বাইরে গিয়ে খাল, নালা ও নদীতে মিশছে। সিটি করপোরেশনের ড্রেনের পানি বারনই নদীতেও গিয়ে পড়ে। ফলে ড্রেনের সঙ্গে চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্যও প্রাকৃতিক জলাধারে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।এতে পানি ও মাটি দূষণের পাশাপাশি জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।



‘ড্রেনে রক্ত, গজ, সিরিঞ্জ’:-

পবা উপজেলার বাসিন্দা আবদুস সালাম বলেন, এলাকার ড্রেনে প্রায়ই চিকিৎসাবর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। রক্ত, তুলা ও গজের মতো বর্জ্য ড্রেনের পানিতে ভাসতে দেখা যায়। দুর্গন্ধের পাশাপাশি অনেক সময় সিরিঞ্জ, তার ও কাচের বোতলের মতো বর্জ্যে পা কেটে যায়। পরে চুলকানি ও ঘা হয়।

আরেক বাসিন্দা মর্জিনা বেগম বলেন, ড্রেনের পানি অত্যন্ত নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। ওই পানিতে পা ভিজলে পরে শরীরে চুলকানি হয়, অনেক সময় পায়েও ছোট ছোট ঘা দেখা দেয়। চিকিৎসাবর্জ্য ড্রেনে ফেলা বন্ধ না হলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।


জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা:-

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের মতো নয়। এতে রোগজীবাণু ও ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকতে পারে। শোধন ছাড়া এসব বর্জ্য পরিবেশে গেলে পানি ও মাটি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।


রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ভায়রোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, হাসপাতালের তরল বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকতে পারে। এসব বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে গেলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।


‘ভাড়া ভবনে ইটিপি বসানো কঠিন’:-

বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের সংগঠনও স্বীকার করছে, তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

রাজশাহী বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বর্তমানে তারা একটি হাসপাতালের একটি বাথরুমে এসব বর্জ্য কিছুটা পরিশোধন করে পয়োনিষ্কাশন লাইনে দেন। সরকার যদি পুরোপুরি পরিশোধনের নির্দেশ দেয়, তারা তা মেনে চলবেন।

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকি। এখানে চাইলেই তো আর ইটিপি বসাতে পারি না। তবে আমাদের সময় দিলে আমরা ইটিপি বসাব।’


চার প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ:-

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বলেন, নিয়মানুযায়ী তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়ম না মানলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

তিনি বলেন, চলতি বছরে তরল বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ চারটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত তারা শোধনাগার নির্মাণ করবে।


নিয়ম মানার নির্দেশ:-

রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, চিকিৎসাবর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে। যারা নিয়ম মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


নজরদারিই বড় প্রশ্ন:-

রাজশাহীতে ২১৬টি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে কার্যকর তরল বর্জ্য শোধনাগার মাত্র দুটিতে—এই তথ্যই প্রশ্ন তুলছে পুরো ব্যবস্থাপনার তদারকি নিয়ে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ইটিপি নেই, তাদের তরল বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে নিষ্কাশন করা হচ্ছে এবং তা পরিবেশে মিশে যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি কতটা কার্যকর, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কার্যকর বর্জ্য শোধনব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেগুলো বাস্তবে চালু আছে কি না, নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না এবং শোধন ছাড়াই কোনো বর্জ্য ড্রেনে যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

কারণ মানুষকে সুস্থ করতে গিয়ে তৈরি হওয়া বর্জ্য যদি শেষ পর্যন্ত নদী-খাল ও জনবসতির পরিবেশে গিয়ে মেশে, তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।